সত্যজিৎ রায়: যে মহীরুহকে বোঝেনি বলিউড

বলা হয় সত্যজিৎ রায়কে যে জানে না সে হচ্ছে ছবি-মূর্খ মানে চলচিত্র বিষয়ে অশিক্ষিত। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে বলিউডের ৮০ ভাগ নির্মাতা ও কলা-কুশলীরা সত্যজিতের কোন কাজ দেখে না, জানে না, এবং জানতে বা দেখতেও চায় না। এমনকি অনেকে নাকি গর্ব করে বলে তারা সত্যজিতের মুভি দেখবে না কখনও। সাদাকালো মুভি দেখার ধৈর্য তাদের নেই। এটা আমার কথা না, ভারতীয় পত্র-পত্রিকার বিদগ্ধ চলচিত্র সমালোচকদের দেয়া তথ্য।

এই গাড়লীয় উন্নাসিকতার পেছনে কারণ অনেকগুলো। সত্যজিতের কনটেন্ট বাস্তব জীবন নির্ভর, কোন গাঁজাখুরি বা ফালতু রোমান্টিক ন্যাকামি নেই। স্বাধীনতা উত্তর ভারতের শাসকরা হাজার হাজার বছরের বিভক্ত ভারতকে একত্রে রাখতে গিয়ে এমন সব উদ্ভট কৌশল নিয়েছিল যার বলি সত্যজিতের মত নির্মাতাদের হতে হয়েছিল।

খেটে খাওয়া শ্রমিক, পোড় খাওয়া মধ্যবিত্ত আর লোভী ধনীদের সমাজের আসল ছবি না দেখিয়ে, সৃজনশীল বিনোদন না দিয়ে তাদের সামনে এক উদ্ভট ‘আমেরিকান ড্রিম’ টাইপের মুলা ঝুলানো হয়েছিল। একই ছবিতে অবাস্তব প্রেমের গল্প ফেঁদে তার মধ্যে কিছু অবাস্তব আ্যকশন, কিছু কমেডি আর কিছু সেক্সিস্ট ডায়ালগ মিশিয়ে মাসালা মুভির রেসিপি চালু করে ধনীদের আরও ধনী করা, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তকে অবাস্তব ঘোরের মধ্যে রাখা আর কিছু সৃজনশীল মানুষকে ভুল কাজে ব্যস্ত রাখতে প্রণোদনা দিতেই স্বাধীনতা উত্তর ভারতের সরকারগুলোর কাছে নিরাপদ তরিকা মনে হয়েছিল। এবং এভাবেই কলকাতাকে ছাপিয়ে মুম্বাইয়ের উত্থান-গাথা রচনা করা হয়েছিল।

সত্যজিতের ছবি পৃথিবী জয় করলেও খোদ মুম্বাই, দিল্লী, কানপুর, চেন্নাই, কেরালার মত ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র আর চলচিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে ছিল অবহেলিত। এখন যেকোন ছবি কেরালায় হিট হলে সেটা হিন্দিতে মুক্তি পায় বা রিমেক হয়, তখনও হত। কিন্তু সচেতনভাবে অলিখিত সরকারী নির্দেশে সত্যজিতের ছবি মুক্তি দেয়া হত না দেশের অন্য অঞ্চলগুলোতে, এমনকি আর্ট সেন্টারগুলোতেও দেখানো হত না, বাজারে কিনতেও পাওয়া যেত না। যদিও সত্যজিতের ৩০টি ছবির প্রতিটিই দর্শকনন্দিত, সরল ভাষায় যাকে বলে সুপার হিট এবং শুধু পশ্চিম বঙ্গের বা মুম্বাইয়েরই নয়, সারা পৃথিবীর দর্শক সমালোচকদের কাছেই নন্দিত। তবু কেন এই অলিখিত নিষেধাজ্ঞা?

যদিও শুনতে অদ্ভুত লাগে তিনি রেকর্ড সংখ্যক বার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন (৩২ বার ), ভারত রত্ন, দাদা সাহেব ফালকে, পদ্মশ্রী কি দেয়া হয়নি তাকে? এবং যখন তিনি অস্কার পেলেন, ভারতের মিডিয়া ও জনগণ দেশের অস্কার প্রাপ্তির খবরের চেয়ে হিন্দি মাসালা সিনেমা নিয়ে বেশি মশগুল ছিল। কী আশ্চর্য!

তবে তাঁকে কোন পুরস্কারের গণ্ডিতে আটকে রাখা যায় না। শুধু বাংলা চলচিত্র নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের একজন অবিকল্প ব্যক্তিত্ব সত্যজিত। যারা ছবি বানাতে চায় শুধু তাদের জন্য না, যারা ছবি দেখতে পছন্দ করে, তাদেরও তার মোট ৩৬ টা কাজ (পূর্ণ দৈর্ঘ্য ও স্বল্প দৈর্ঘ্য মিলিয়ে) দেখা উচিত। সত্যজিতের ছবি বলতে যারা মনে করে তিনি দারিদ্র আর বাস্তবতাকে রেপ্লিকেট করেছেন, তাদের ধারণা ভুল, তার ছবিতে সবকিছু ছাপিয়ে এসেছে জীবন, এবং তার গল্পের ফ্রেম এমন সহজ আর সুন্দর যে গল্পে পাত্র-পাত্রীর জীবনের পরিণতি যা-ই হোক না কেন সেটা সার্থক ও শিল্পোত্তীর্ন জীবনই মনে হয়। সত্যজিতের ছবি দেখা মানে নিজেদের জীবনের অর্থই এক রকম খুঁজে পাওয়া।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাত্র দুজনকে চলচ্চিত্র পুরস্কার দেয়া হয়েছিল। একজন হচ্ছেন চার্লি চ্যাপলিন আরেকজন সত্যজিৎ। তাকে পড়ানো হয় পৃথিবীর প্রায় সব ফিল্ম ইন্সটিটিউটগুলোতে। এখন যে কন্টেন্ট নির্ভর ছবি তৈরির ধারা বলিউডে প্রবাহিত হচ্ছে এটা নেটফ্লিক্স না, সত্যজিতের অবদান। কেননা, ২০০০ সালের পর যারা ভাল ছবি বলিউডে বানাতে শুরু করেছিলেন, সেই অনুরাগ বসু, অনুরাগ কাশ্যপ, দিবাকর ব্যানার্জি এবং আরও কয়েকজন, এরা মূলত সত্যজিত ঘরানার ফিল্ম স্কুলের আর তাদের ইন্টারভিউগুলোতেও তারা সত্যজিতের কথা অকাতরে বলে যাচ্ছেন। এছাড়া ঋতুপর্ন ঘোষ, অপর্না সেন, কৌশিক গাংগুলি, গৌতম ঘোষের মত এক ঝাক মেধাবী পরিচালকের গুরুও তিনি।

সত্যজিতের নাম রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর পূর্বপুরুষের বাড়ি ছিল ময়মনসিংহ। তাঁর পূর্বপুরুষরাই এদেশে ক্রিকেট খেলার প্রচলন করেছিলেন। যাই হোক, তাঁর সম্পর্কে বলে শেষ করা যাবে না। ২৩ এপ্রিল তার মৃত্যুদিন, আবার বিশ্ব বই দিবসও। তিনি যে ছবিগুলো বানিয়েছেন সেগুলোর কাহিনী বেশিরভাগই কিন্তু নিজেই লিখেছিলেন যার সাহিত্য মূল্য অসাধারণ। তাই হয় সত্যজিৎ দেখুন না হয় পড়ুন। তাকে দেখা বা পড়া মানেই হল লকডাউনের এই সময়টার অর্থপূর্ণ ও সার্থক ব্যবহার।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: