পিপিনের গল্প

পিপিন খুব আদরের খরগোশ। এত আদুরে যে পিপিনকে ভালোবাসেনা এরকম মানুষ পাওয়াই যাবেনা। অবশ্য শুধু পিপিন কেন? পৃথিবীর যেকোনো খরগোশই অনেক আদরের। পিপিনের বয়স এক বছরের কিছু বেশি। বাদামী রঙ এর খরগোশ পিপিনের খরগোশ বাবার নাম ছিলো পুটি আর খরগোশ মায়ের নাম পিংকি। মা পিংকির রঙ ছিলো বাদামী, পিপিন পেয়েছে মায়ের রংটা। পিপিনের বাবা মা দুজনেই দুটো করে। দুজন হলো ওর খরগোশ বাবা মা, আর দুজন হলো ওর মানুষ বাবা মা, যারা পিপিনকে পালে। পালে বলা ভুল হবে, পিপিন ওদের নিজের সন্তানের মতই। নিজের বাচ্চার মত তারা পিপিন কে ভালোবাসে, আদর করে, পিপিনের জন্য খেলনা আর পুতুল কেনে। 

 

খরগোশ বাবা পুটি আর মা পিংকির পাঁচটা বাচ্চা হয়েছিলো একসাথে। পাঁচটা বাচ্চার মধ্যে পিপিন ছিলো সবচেয়ে দূর্বল বাচ্চা। পিপিনের মানুষ মা নাসরিন পিপিনকে আদর করে খরগোশ মায়ের কাছে প্রতি সময়ে এনে ধরে ধরে দুধ খাইয়ে পিপিনকে বড় করেছে, সবল করেছে। পিপিনের জন্মের পরের সময়টা ওর বেশ মজায় কেটেছে। ওর জন্ম রাজশাহী তে। পিপিনের মানুষ মা রাজশাহী কলেজের ছাত্রী ছিলো, সেই সুবাদে পিপিনকে প্রায় সে নিয়ে যেতো রাজশাহী কলেজের ক্যাম্পাসে। ক্যাম্পাসের মাঠের সবুজ ঘাস পিপিন খেতো মনের আনন্দে। 

 

পিপিনের বাবা পলাশ ঢাকায় থাকতেন। পিপিনের মায়ের পড়ালেখা শেষ হওয়ার পর বাবা রাজশাহী গিয়ে পিপিন আর ওর মা কে ঢাকায় নিয়ে আসেন। সেবার পিপিনের প্রথম ট্রেনে চড়া। পিপিনের মানুষ মা তাকে যত্ন করে একদম নিজের বাচ্চার মত কোলে করে পুরোটা সময় জার্নি করেন। জার্নির সময়ে মাঝে মাঝে খাইয়েও দেন পিপিনকে, ঠিক যেমনটা আমরা করি আমাদের বাচ্চাদের ক্ষেত্রেও। ছোট্ট আদুরে পিপিন ট্রেনের মত অচেনা বাহনেও যেন মানুষ মা বাবাকে দেখে ভরসা পায়, নির্ভয়ে মায়ের কোলে বসে সে জার্নি করে, মায়ের দেওয়া খাবার খায়। পিপিনের সফরসংগী সেবার শুধু তার বাবা মাই না, বরং ওর মায়ের শখের বাজেরিগার আর ককটেল পাখি ছিলো খাচায়, তাদের ট্রেনের সিটের ঠিক নিচেই রাখা ছিলো। ৪ টা পাখির মধ্যে একটার নাম ছিলো পেপসি। বাকিগুলোর নাম তখনও দেওয়া হয়নি। 

 

ঢাকায় আসার পর পিপিনের বাবা মার যেমন নতুন জীবন শুরু হলো, তেমনই পিপিনেরও শুরু হলো নতুন জীবন, নতুন পরিবেশে। রাজশাহীর সবুজ পরিবেশ ছেড়ে এবার তবে বহুতল ভবন আর যানযটের শহরে এখন থেকে সে থাকবে। পিপিন যেহেতু অনেক আদরের আর ওর মানুষ বাবা মা ওকে নিজের বাচ্চার মতই ভালোবাসে, সেজন্য সে বাসার ভেতর ছেড়ে দেওয়াই থাকে, মনের সুখে ঘুরে বেড়ায় ঘরের এদিক ওদিক। নাসরিন পিপিনের জন্য একটা নরম পুতুল কিনে আনেন, যেটা মেঝেতে রেখে দেওয়া থাকে ওর জন্য। পুতুলটার নাম দেওয়া হয় ভুতুম। পিপিনের এক খরগোশ দাদু (পিপিনের পূর্বপুরুষ) এর নামানুসারে পুতুলের নাম ভুতুম রাখা হয়েছিলো। শুধু পুতুল ভুতুমই না, ওর জন্য বিছানা হিসেবে কিনে আনা হয় একটা রংগিন শতরঞ্জি, আর একটা বালিশ। অবশ্য সেই বালিশ পিপিন এক সাইড কামড় দিয়ে কেটে ফেলে পরে। 

 

পিপিন ঢাকার নতুন বাসায় আদর যত্নে বড় হতে থাকে, মানুষ মা নাসরিন আর বাবা পলাশের আদরের কোনো কমতি হয়না। তাদের সাথেই পিপিনের সব খুনসুটি দুষ্টুমি। পিপিন খরগোশ হলে কি হবে? অভিমানও করে বেশ। বাবা মা একটু বকা দিলেই বা ব্যস্ত থাকলেই অভিমান করে থাকে পিপিন, চুপচাপ কোনায় বসে থাকে, কাছে আসলেই কামড় দেয়। আবার অভিমান কমে গেলেই চেটে দেয় আদর করে। মা ওকে আদর করে অনেক সময়ে সাজিয়ে দেয়, কপালে টিপ পড়িয়ে দেয়। পিপিন টিপ পড়তে যে অনেক ভালোবাসে তা তখন তার এক্সপ্রেশন দেখলেই বোঝা যায়। মায়ের সাথে সেজে ও কপালে টিপ দিয়ে তোলা অনেক ছবিও আছে পিপিনের। ওর জন্য পার্টনার হিসেবে একটা কালো খরগোশ নিয়ে আসা হয় একদিন, ওর নাম রাখা হয়। কিন্তু পিপিন কালু কে খুব খামচি দিতো, তাই কালু কে পরে আবার ফেরত দিয়ে আসা হয়। 

পিপিন ঘুরতেও ভালোবাসে খুব। বাবা মার সাথে, বাস, ট্রেন, রিকশা, গাড়ি, সিএনজি সবকিছুতে করে ঘুরেছে সে। মাঝে মাঝে মানুষ মা নাসরিনের কোলে করে শপিং এও যায়। ওর জন্য ঘাস আনতে গেলে পিপিনকেও সাথে নিয়ে যান পলাশ আর নাসরিন, তখন ওকে ঘাসের উপর ছেড়েও দেওয়া হয়, পিপিন মনের আনন্দে ঘাস খায় তখন। 

 

মানুষ বাবা মার মতই পিপিন তাদের কেও খুব ভালোবাসে। যদি পলাশ বা নাসরিন অসুস্থ থাকে, সেও মন খারাপ করে, চুপচাপ বসে থাকে সে, যতক্ষন তারা সুস্থ না হয়। বাবা মা সুস্থ হওয়ার পর একদিন পিপিনও অসুস্থ হয়ে পড়ে। সবদিক থেকেই ঠিক আছে কিন্তু হঠাত দেখা যায়, এক সপ্তাহের মধ্যে পিপিনের ওজন ৫০০ গ্রাম কমে যায় যা সাধারনত হয়না। নাসরিন ও পলাশ চিন্তিত হয়ে পড়ে। এদিকে করোনাভাইরাস চলছে, সেই সাথে লকডাউন, তাই চাইলেও পিপিনকে পশু হাসপাতাল বা কোনো ভেটের কাছে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়না। পরে পিপিনের মানুষ বাবা পলাশ পিপিনের জন্য ওষুধ নিয়ে আসেন। পিপিন আদরের হলেও চঞ্চলও অনেক। ওষুধ তো সে খাবেইনা। পিপিন কে ওষুধ খাওয়ানো যেন একটা যুদ্ধ। সোজা করে রেখে কোনো ওষুধই খাওয়ানো যায়না ওকে, ওষুধ খাওয়ানোর ড্রপার দেখলেই মানুষের মত দৌড় দিয়ে লুকায় খাটের নিচে। “পিপিন আসো বাবু বাইরে আসো” – এরকম আহ্লাদ করে বাবা মা ডাক দিলেও পিপিন বের হয়না।  পরে অনেক ভেবে চিন্তে নাসরিন পিপিন কে কোলে নিয়ে ওষুধ খাইয়ে দেয়। 

 

ধীরে ধীরে পিপিন সুস্থ হয়ে উঠে। এভাবে করে রমজান মাস চলে আসে। রোজার দিনে একদিন লকডাউনের ভেতরে পলাশকে বাইরে যেতে হয় জরুরি কাজে। বাইরে বের হবার সময়ে দরজা খোলার পর দরজা খোলা পেয়ে পিপিন কোনোভাবে বাইরে চলে যায় যা নাসরিন বা পলাশের নজরে পড়েনি শুরুতে। বাইরে পলাশ আর বাসায় নাসরিন ব্যস্ত ছিলেন তাই পিপিনকে সেভাবে দেখেন নি, এর মধ্যে কয়েকবার মেইন দরজায় আচড়ানোর শব্দ পেলেও নাসরিন ওদিকে যাননি, ভেবেছেন ঘরেই আছে খাটের নিচে বা কোনো কোনায়। ইফতারের আগেই পলাশ ফিরে আসেন। ইফতারের পর পিপিন কে না পেয়ে নাসরিন দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। সারা বাড়ি খুজেও পাওয়া যায়না ওকে। শেষে একটু সন্দেহ হলে নাসরিন বাসার মেইন দরজা খুলে দেখেন পিপিন বাইরে দাড়িয়ে, আর তখন যে দরজা আচরানোর শব্দ পাওয়া যাচ্ছিলো, সেটা আসলে পিপিন করছিলো। পিপিন প্রায় দুই ঘন্টা মত বাইরে ছিলো, কিন্তু লক্ষী খরগোশ, সব বোঝে, তাই এদিক ওদিক না গিয়ে দরজার কাছেই ছিল পুরো সময়ে। পিপিন কে দেখে পলাশ ও নাসরীনের ভয় দূর হয়। পরে পিপিনের রাগ আর কমেনা, পলাশ বা নাসরিন আদর করতে আসলেই রেগে যায়, দূরে সরে গিয়ে একা একা থাকে। এরপর থেকে দুজনেই পিপিনকে সাবধানে রাখেন আর খেয়াল রাখেন সবসময়ে। নাসরিন আর পলাশের জীবনে পিপিন এসেছে ভালোবাসা নিয়ে। তার দেওয়া আনন্দ তে ভরে থাকে সারাবাড়ি সবসময়ে। 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: