আমি জানি এই ধ্বংসের দায়ভাগে…

[খুলনায় ‘গরীবের ডাক্তার’ হিসেবে খ্যাত আব্দুর রকিব খানকে এক মৃত রোগীর আত্মীয়রা মারধর করে গত ১৫ জুন রাতে। গত ১৬ই জুন তিনি হাসপাতালে মারা যান।]

ডাক্তার রকিবের হত্যাকাণ্ড ও তাতে মানুষের প্রতিক্রিয়া একটা বিষয়ই প্রমাণ করে। আমরা বোকার স্বর্গে বসবাস করছি। ডাক্তার ও জনগণ পরস্পরের শত্রুপক্ষতে পরিণত হয়েছে। বলা ভাল, পরস্পরকে শত্রুপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেটা সম্ভব হয়েছে স্বাস্থ্যখাতে ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি ও অবহেলার ফলে। যে রোগীটি মারা গেছেন, তিনি যে চিকিৎসকের অবহেলায় মারা গেছেন, সেটা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। সেটা তদন্তসাপেক্ষ। আর রোগীর পরিবারের সম্মতিপত্র ছাড়া অস্ত্রোপচার করা হয় বলে আমার জানা নেই। তাহলে কি অস্ত্রোপচারের আগে তারা ভুল বুঝেছিলেন? বা ডাক্তার কি ঝুঁকিটা বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছিলেন? যদি ব্যর্থ হয়ে থাকেন বা ধরে নিলাম, তিনি ভুলই বুঝিয়েছেন, সে জন্যে কি তাকে মেরে ফেলা জায়েজ?

ডাক্তারের সম্ভাব্য ভুল বা অবহেলা বা পেশাগত অনৈতিকতার কারণে তাকে মেরে ফেলা জায়েজ কিনা এই প্রশ্নে আমার সহনাগরিকবৃন্দ অনেকেই রা রা করে উঠবেন? বলবেন, জালিমের শাস্তি রাষ্ট্র না দিলে জনগণই তার ব্যবস্থা করবে। এইখানে আবার নতুন করে দুটো প্রশ্নের উদয় হয়। তাহলে বিচারব্যবস্থা কি নষ্ট হয়ে গেছে? অবশ্যই নষ্ট হয়ে গেছে। একজন দরিদ্র ভিকটিমের ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। হিসেবমত বাদী বা বিবাদী যে কারো আর্থিক সামর্থ্য না থাকলে সরকার তাকে প্রসিকিউটার সরবরাহ করবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু, আমাদের মুনাফাতাড়িত ব্যবস্থায় (কেবল মুনাফাতাড়িত না, ডাকাতি মুনাফাতাড়িত) ন্যায়বিচারও একটি পণ্য যা প্রভূত অর্থ ব্যয় করে খরিদ করতে হয়। পাবলিক প্রসিকিউটাররা প্রায়শই বিক্রি হয়ে যান প্রতিপক্ষের কাছে, এমনকি জজসাহেবরাও সেই আঁতাতে যোগ দেন। এই অবস্থায় বাদী বা বিবাদী কারো পক্ষেই ন্যায়বিচার পাওয়া দুরূহ যদি তার ট্যাঁকে পয়সা না থাকে।

এবার এই অবস্থার বিপরীতে জনগণের বিচারের ভার নেবার চিত্রটা দেখা দরকার। এটা হলো দ্বিতীয় প্রশ্ন। জনগণ কি আদৌ বিচার চায়? আসলে জনগণ বিচার চায় না। দুঃখজনক হলেও সত্য, জনগণ ন্যায়বিচার জিনিসটা এখনো বুঝে উঠতে পারেনি। ন্যায়বিচার আর প্রতিশোধের মধ্যে যে একটা ফারাক আছে, সেটা মানতে নারাজ বেশিরভাগ লোকই। কেবল আমাদের দেশে না, সারা বিশ্বের অধিকাংশ লোকই প্রতিশোধপরায়ণ, ন্যায়বিচারপ্রার্থী না। জনগণ ন্যায়বিচারের ভার নিলে তাকে একটা বিকল্প বিচারব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। জনগণ যদি রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থাকে খারিজ করে নিজে বিচার করতে চায়, তাহলে তার ব্যবস্থাটি রাষ্ট্রের ব্যবস্থা থেকে উন্নত হতে হবে। প্রতি-প্রত্যেকে যদি জাজ-জুরি-এক্সিকিউশনার হয়ে বসে, তাহলে তো মহাবিপদ। সন্দেহ হলেই তাকে শাস্তি দেওয়া তো কোনো বিচার হতে পারে না। কিন্তু, আমরা যেহেতু ন্যায়বিচার জিনিসটাই বুঝতে অক্ষম, ফলে আমাদের কাছে প্রতিশোধটাই বৈধতা পেয়ে গেছে।

স্বাস্থ্যখাতের কথা বলতে গিয়ে বিচারব্যবস্থা এসে পড়ল। এসে তো পড়বেই, স্বাস্থ্যখাত তো বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ না। বিচারব্যবস্থা নিয়ে কথা চালালে শিক্ষাব্যবস্থা আসবে। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কথা চালালে আইনসভা আসবে। আইনসভা নিয়ে কথা চালালে গার্মেন্টস শিল্প আসবে। গার্মেন্টস শিল্প নিয়ে কথা বলতে গেলে সেটা বাউন্স ব্যাক করে আইনসভায় ফেরত আসবে। তারপর কোনো এক পর্যায়ে কথাপ্রসঙ্গে আরো অনেকেরই নাম আসবে যাদের নাম বলা বারণ। আমার রাষ্ট্র জাল বিছিয়ে ওঁত পেতে আছে, সেই নামগুলো আবার কখন উচ্চারিত হবে। উচ্চারিত হওয়া মাত্র খপ করে ধরে খাঁচায় পুরে দেবে। আমিও তখন বিচারব্যবস্থার বলি হয়ে যাব এবং মনে মনে আপসোস করবো, ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকলে বরং ভাল হতো। দোষারোপের জন্য রাষ্ট্রের চেয়ে ঈশ্বর অনেক বেশি নিরীহ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: