আইডেনটিক্যাল টুইন বা একই রকম দেখতে জমজদের জিন রহস্য

বাঙলায় পপুলার সায়েন্সের মজার মজার বিষয়াদি নিয়ে লেখালেখির পরিমাণ জ্ঞান বিজ্ঞানের অন্যান্য বিভাগগুলোর চাইতে তুলনামূলকভাবে অপ্রতুল। অথচ এমন এমন সব মজার বিষয় ঘটে বিজ্ঞান দুনিয়ায়, যেগুলো কম বেশি আমাদের চোখের আড়াল থেকে যায়।

কৌলিনতত্ত্ব অর্থাৎ জেনেটিক্স এর বিস্তর ডিএনএ,আরএনএ, জিন, জিনোমের জগতে প্রবেশ করলে এমন সব মজার জিনিসপত্তরের দেখা মেলে, যেগুলো নিয়ে ভাবতে গেলে মগজ ঘেঁটে যাওয়ার অবস্থা হয়!

সেদিন নেইল টাইসনের কসমস ডকুমেন্টারি সিরিজের একটা এপিসোড দেখার মধ্যে যখন আমাদের জীবজগতের ইভোলিউশন নিয়ে আলাপ আলোচনা হচ্ছিলো, তার এক পর্যায়ে নেইল উল্লেখ করলেন যে গাছপালা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীব, মাছ, পাখি, কীটপতঙ্গ থেকে শুরু করে আমাদের সবারই ডিএনএ কোডিংয়ে কিছু মৌলিক সামঞ্জস্য থাকে, যেমন সুগার মেটাবোলিজম ফাংশন এবং সেটার সাথে সম্পর্কিত ডিএনএ কোডিং, যেটা সব প্রাণীর মধ্যে একেবারেই একই। কিন্তু তারপরেও আমাদের সার্বিক গঠনের সাথে সম্পর্কযুক্ত বাকি কোডিংগুলোর মাঝে ভিন্নতাও আছে প্রচুর,এক্সেপ্ট আইডেন্টিক্যাল টুইন!  আরে হ্যাঁ, তাইতো! একাডেমিকেও তো পড়েছিলাম, মনোজাইগোটিক টুইন বা একই জাইগোট বা ভ্রুণ থেকে জন্মগ্রহন করা যমজদের ডিএনএ সিকোয়েন্স হুবহু একইরকম হয়!  এইতো মাথায় চলে আসলো হুট করে কতগুলো গাঁজাখুরি প্রশ্ন আর কৌতুহল! তারপর যা করি আমরা আরকি, গুগলমামার দ্বারস্থ হই! আমার মাথায় প্রথম যে প্রশ্নটা এসেছিলো, সেটা হচ্ছে ধরুন এই আইডেনটিক্যাল টুইনের একজন একটা অপরাধ করলো, তাহলে সাধারণতই ফরেনসিক জেনেটিক্সে যে স্ট্যান্ডার্ড ডিএনএ টেস্টিংয়ের মাধ্যমে অপরাধী শনাক্ত করা হয়, সেটা তো কোন কাজে দেবে না! কারণ যমজদের উভয়েরই ডিএনএ সিকোয়েন্স হুবুহু এক! তবে এই লিগ্যাল কোনানড্রামের কি কোন সমাধান নেই?! নিশ্চই আইডেনটিক্যাল টুইনরা দুশ্চিন্তায় পরে যাবেন! হায়হায়, তাহলে আমার যমজ ভাইটি বা বোনটি কোন কুকর্ম করে আসলে আমিও তো ফেঁসে যাব!

রিল্যাক্স, এই দশকে সেই দুশ্চিন্তার কোন দরকার নেই, কারণ বায়োলজিকাল সায়েন্সের পসার এবং প্রসার অনেকখানি বেড়েছে। ডিএনএ মেল্টিং এর মতোন কিছু বায়োটেকনোলজি বেড়িয়েছে বর্তমানে, যা দিয়ে আইডেন্টিক্যাল টুইনদের ডিএনএ’র মাঝেও যে সুক্ষ্ম তারতম্য আছে, সেটা এখন নিরুপন করা সম্ভব। কিন্তু  গত কয়েক দশক আগেও যখন এটা সম্ভব ছিল না, এমন কিছু টুইন ক্রাইম কেইস ছিল, যেখানে এই লিগ্যাল কোনানড্রামগুলোর সমাধান করতে হয়তো স্বয়ং শ্রদ্ধেয় শার্লক হোমসেরও তালুর ব্রহ্মরন্ধ্র দিয়ে ঘাম ছোটবার উপক্রম হত। ফরেনসিক জেনেটিক্সে এই ডিএনএ টেস্ট মূলত অপরাধী শনাক্তকরণে এবং প্যাটারনিটি টেস্টে বা পিতৃত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে শতভাগের চাইতেও অধিক নিঁখুত ফলাফল দিয়ে থাকে।

প্রচলিত এই ডিএনএ টেস্ট মানুষের সম্পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কারেরও আগে থেকেই করা হত, কেননা এর জন্য প্রয়োজন একজন মানুষের অতি সামান্য পরিমাণ ডিনএনএ ফ্র্যাগমেন্ট, যেখানে পাওয়া যায় STR (Short Tandem repeat) নামক এক বস্তুর, এই হরেকরকমের STR- গুলো জীবের ডিএনএ ফ্র্যাগমেন্টের ওপর গার্নিশের মতোন ছড়ানো থাকে এবং একেক জীবের মধ্যে এগুলোর একেকভাবে মিউটেশন হয়,কিছুটা হেড টেইল খেলার মতোন এবং একেক মানুষের মাঝে একেকরকম হয় এদের গঠন। এদের মধ্যে মাত্র তেরোটি STR ‘কে ব্যবহার করেই একজন অপরাধীর ডিএনএ’র সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এই প্রক্রিয়া এতটাই নিঁখুত যে দুজন অসম্পর্কিত  মানুষের মাঝে এই মিল খুঁজে পাওয়ার সম্ভাব্যতা লেস দ্যান ওয়ান ইন অ্যা ট্রিলিয়ন, আর পৃথিবীতে মানুষই আছে সাড়ে সাত বিলিয়নের মতোন, সুতরাং, এরর আসার সম্ভাবনা নেই একদমই। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই টেস্টটি আইডেনটিক্যাল টুইনের ক্ষেত্রে একদমই অকার্যকর। যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরীতে ২০০৪ সালে হলি ম্যারি অ্যাডামস্ নামের একজন নারী তার স্বামী রেইমন্ড মিলারের বিপরীতে প্যাটারনিটি সু্ইট জিতেছিলেন। ডিএনএ টেস্টে প্রমাণিত হয়েছিলো যে রেইমন্ডই সন্তানের পিতা। কিন্তু মিস্টার মিলার কোর্টে আপিল করেন যে তার স্ত্রীর সাথে তার যমজ ভাই রিচার্ডেরও শারীরিক সম্পর্ক ছিল। এরপর দুজন ভাইয়েরই ব্লাড টেস্ট করে দেখা গেল, দুই ভাইয়েরই সন্তানের পিতা হবার সম্ভাব্যতা ৯৯.৯%!  ডিএনএ’র এ কি পরিহাস!  অগত্যা কোর্টকে বাধ্য হয়ে অন্যান্য সবুদের ওপর নির্ভর করে রায় দিতে হয়েছিল।

এটার পর মাথায় আসলো আইডেন্টিক্যাল টুইন নিয়ে আরও একটি মজার ব্যাপার। ধরুন, দুজন যমজ বোন ও দুজন যমজ ভাইয়ের মাঝে বিয়ে হলো। বাস্তবে কিন্তু এইরকম বিয়ের অস্তিত্বও আছে, যেটাকে বলে ‘কোয়াটারনারী ম্যারেজ’। তো, আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো, জেনেটিক্সের হিসাবে হিসেব করলে এই দুই দম্পতির ছেলেমেয়েগুলোর তো কাসিন হবার কথা না, আপন ভাইবোন হবার কথা!

এখন নিশ্চই আমাকে মনে মনে গালাগাল দেয়া শুরু করতে পারেন! কিন্তু বিজ্ঞানও একই কথাই বলে। পেনসেলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কৌলিনততত্ত্বের অধ্যাপক লরা অ্যালম্যাসি’র একটা সহজ ব্যাখ্যা আছে এ বিষয়ে, উনি বলেছেন, প্রত্যেকটি সন্তানের জন্মগ্রহনের ক্ষেত্রে পিতা মাতা থেকে ডিএনএ’র সমন্বয়কে উনি তুলনা করেছেন একটা মার্বেলের জার থেকে একমুঠো মার্বেল তুলে নেয়ার সাথে। অর্ধেক মার্বেল আসবে বাবার জার থেকে, আর বাকি অর্ধেক আসবে মায়ের জার থেকে, সহজ হিসাব। কাসিন বা চাচাত খালাত মামাতো ভাইবোনের ক্ষেত্রে যেটা হচ্ছে, সকলেরই ভিন্ন ভিন্ন ধরণের মার্বেল জার থেকে মার্বেল এসেছে। কিন্তু এই যমজ দুই দম্পতির ক্ষেত্রে যা হচ্ছে, সেটা হল, দুইটি আলাদা মার্বেল জারের সেট কিন্তু সেই সেটগুলো আইডেন্টিক্যাল, হুবুহু একই গড়নের দুইসেট মার্বেল জার থেকে দম্পতিদ্বয়ের সন্তানেরা মার্বেল সংগ্রহ করেছে। সুতরাং, মানতে কষ্ট হলেও এটাই সত্য যে এই দম্পতিদ্বয়ের ছেলেমেয়েগুলোর মধ্যকার জেনেটিক ম্যাটেরিয়ালের সামঞ্জস্য ঠিক তেমনই হবে, ঠিক যেমনটা আপন ভাইবোনদের মাঝে থাকে!

আরও একটি ব্যাপার যেটা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিলো, সেটা হলো ডপেলগ্যাঙ্গার বা হবুহু একইরকম দেখতে একাধিক মানুষেরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণেও এখন অনেকেই নিজের ডপেলগ্যাঙ্গারদের সন্ধান পেয়ে যান। আমার মনে প্রশ্ন জাগলো, নেহাতই কোন কারন ছাড়াই, শুধুমাত্র জেনেটিক রিকম্বিনেশনের কারনেই কি আমরা হুবুহু চেহারার মানুষদের দেখা পাই? এর পেছনে কি কোনও যোগসূত্রই নেই?

তখন এ নিয়ে একটু ঘেঁটেঘুটে দেখলাম এই ডপেলগ্যাঙ্গার নিয়েও মজার মজার ঘটনা ঘটেছে সাম্প্রতিকই। আয়ারল্যান্ডে হুবহু একই রকম দেখতে দুজন সোশ্যাল সাইটের মাধ্যমে একজন আরেকজনের সাথে দেখা করেছেন এবং নিজেদের ডিএনএ টেস্টও করিয়েছেন!  এদের মধ্যে একজন বলছিলেন, ‘আমাদের হাসি, বাচনভঙ্গি, মুখয়াবয়বের ভঙ্গি এমনকি চিন্তা ভাবনার ক্ষেত্রেও এত বেশি সামঞ্জস্য, যেটা হতবাক করার মতোন, অথচ আমরা কেউ কাউকে চিনিও না এবং আমাদের কোনও আত্মীয়তার সম্পর্কও নেই’।

তাদের ডিএনএ টেস্টের ফলাফল ছিল অবাক করে দেয়ার মতোনই!

টেস্টের ফলাফল ছিল এরকমঃ
ফুল সিবলিং হবার সম্ভাব্যতা- ০.০০০৬%
হাফ সিবলিং হবার সম্ভাব্যতা- ০.১%

২০,০০০ বছরের মাঝে কমন অ্যানসেস্টর শেয়ারের সম্ভাব্যতা। শেষোক্ত টেস্টটির ফলাফল আসলে শতাংশে প্রকাশ করা হয় না, এখানে তার বদলে হ্যাপলোগ্রুপ হিসেবে অক্ষরের ব্যবহার করা হয়। এই অক্ষর ব্যবহৃত হয় একটা জেনেটিক পপুলেশনের মধ্যে প্যাট্রিলাইনিয়াল বা ম্যাট্রিলাইনিয়াল লাইনে  কমন অ্যানসেস্টরের অস্তিত্ব নির্ধারণের জন্য। কিন্তু খুবই মজার ব্যাপার হলো তাদের দুজনের হ্যাপলোগ্রুপ ছিল আলাদা!   অর্থাৎ ২০,০০০ বছরের মাঝেও তাদের কোন কমন অ্যানসেস্টর ছিল না।

জীব জগত আর জিন জগতে জীববিজ্ঞান এবং কৌলিনবিজ্ঞান  (এই জিন হচ্ছে Gene) বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা, যেমন কোয়ান্টাম ফিজিক্সের মতোনই অদ্ভুত সব রহস্য উদঘাটনে নতুন নতুন পথের সন্ধান করে যাচ্ছে। বিজ্ঞানকে আমি প্রচন্ড ভালবাসি, কেননা বিজ্ঞান পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে জানে, নিরন্তর যুক্তি প্রদানের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তি প্রমাণ এবং খন্ডন করে। মৌলিক চিন্তাধারার রক্তচক্ষুকে কটাক্ষ করে বেপরোয়ার মতো সে তার স্পষ্ট কথা স্পষ্ট করে উচ্চারণ করে যাচ্ছে বিরামহীন। আমি এই বেপরোয়া বিজ্ঞানকেই ভালবাসি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: