কেবিন নাম্বার ৬০৯

আমার পরিচয়? “কেবিন নাম্বার ৬০৯” । ঢাকার অভিজাত এলাকার একটি স্বনামধন্য হাসপাতালের ৬ তলার একটি কেবিন আমি। আসলে কী জানেন? আমরা অনেক মানুষের স্মৃতি, ঘটনার সাক্ষী বয়ে নিয়ে বেড়াই, কিন্তু আমরা জড় বলে সেগুলো প্রকাশ করতে পারিনা। যদি কথা বলার ক্ষমতা থাকতো আমাদের, তাহলে আমরাও হয়তো পারতাম জমে থাকা কথা প্রকাশ করতে। কে জানে? হয়তোবা কোনো কোনো ঘটনা মানুষের উপকারেও লাগতে পারতো। প্রায় ২৪ বছর আগে এই হাসপাতালটি যখন গড়ে ওঠে, তখন আমাকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য স্থপতি, নকশাকারদের চেষ্টার ত্রুটি ছিলোনা, স্থপতি সাহেবের মাথা ছিলো বটে, প্রশংসা করতেই হবে, ৬০৯ নাম্বার কেবিনের নকশা করেছিলেন ভিন্নভাবে। দুটো জানালা দিয়েছিলেন একটি ঘরের পূর্বে আরেকটি দক্ষিণে। বুঝতেই পারছেন, এই কেবিনে যারা থেকেছেন, সবাই মানসিক প্রশান্তির মধ্য দিয়ে কাটিয়েছেন, সকালে সূর্যের আলো আর দক্ষিণমুখী বাতাসের কারণে। অবশ্য দক্ষিণমুখী বাতাস খুব কমজনই পেয়েছে, এসি কেবিন হলে যা হয়, জানালা সবসময়েই বন্ধ । যুগের সাথে ৬০৯ নাম্বার কেবিনের সংস্কারও হয়েছে প্রচুর।

২৩ বছর আগে হাসপাতাল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার পর কেবিন ৬০৯ তে কত মানুষ যে থেকেছে, নিজের চোখে দেখেছি তাদের অসুস্থতা, সুস্থ হওয়ার চেষ্টা, সেই সাথে পরিবারের মানুষ ও বন্ধুদের আকুতি রোগীর প্রতি। তাদের আনন্দ ও কষ্টের ভাগীদার আমিও। আজও মনে আছে ২৩ বছর আগে ৬০৯ নাম্বার কেবিনের প্রথম রোগীটির কথা। এক সকালে বাবা মার সাথে মাত্র এস এস সি পাশ করা এক ছেলে এই হাসপাতালে আসে পেটের ব্যাথা নিয়ে। ডাক্তার দেখিয়ে একটু পরেই ছেলেটি চলে এলো এই কেবিনে। এপেন্ডিসাইটিস। অপারেশন হবে সেদিনই বিকেলে। অপারেশন ঠিক মতই হয়েছিলো ছেলেটার। লোকাল এনেস্থেশিয়া দিয়ে। ভালো লেগেছিলো ছেলেটার সাহস দেখে। অনেকেই অপারেশন ভয় পায় কিন্তু প্রথম থেকেই সে স্বাভাবিকভাবেই ছিলো। কিন্তু রাতে এনাস্থেশিয়ার প্রভাব কেটে গেলে অনেক রাত পর্যন্ত ব্যাথায় কাতরিয়েছিলো ছেলেটা। কোনো কারণে তার বাবা মাও উদ্যোগ নেয়নি পেইনকিলারের, পরে অনেক রাতে পেইনকিলার দেওয়া হয় তাকে। আমি অবলা হয়ে পুরো সময়ে ছেলেটার কাতরানো দেখেছিলাম, মায়া লাগছিলো খুব, মনে হচ্ছিলো আমি যদি পারতাম ছেলেটার ব্যাথা উপশম করতে? পেইনকিলার দেওয়ার পরেই ছেলেটা আরামবোধ করে, সকালে স্বাভাবিকভাবেই ঘুম থেকে উঠেছিলো সে। বিকেলের পর বাড়ি চলে গিয়েছিলো, কেবিনের প্রথম রোগী বলে তার স্মৃতি এখনও অমলীন, তবে ওর ব্যাথার কথা মনে পড়লে আজও খারাপ লাগে।

এরপর মনে আছে বেশ কবছর আগে এক রাতে এই হাসপাতালে এক রোগী এসেছিলেন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে। শুনেছি আগে নাকি কখনোই হার্টে সমস্যা ছিলোনা তার, এটাকের এক ঘন্টা আগেও নিজে ড্রাইভ করে বাইরে গিয়েছিলেন, এমনকি হাসপাতালে ভর্তির সময়ে নিজের নাম, ঠিকানা ভর্তির জন্য টাকা সব নিজেই দিয়েছিলেন। আইসিইউ তে পর্যবেক্ষনে রাখা হয়েছিলো তাকে। ৬০৯ নাম্বার কেবিনটা তার জন্য রাখা হয়েছিলো একটু সুস্থ হলে এই কেবিনে রাখা হবে। কিন্তু নিয়তির কারণে সেই রাতেই ভদ্রলোক মারা যান, এই কেবিনে আর আসা হয়নি তার। আমি তো স্থাবর, নাহলে একবার দেখতে পারতাম মানুষটাকে। কিন্তু স্থাবর বলে তো নড়তে পারিনা। শুধু পরেরদিন সকালে হাসপাতালের কর্মচারীরা ঘর পরিস্কার করতে এসে যখন বলছিলো লোকটির কথা, খুব খারাপ লাগছিলো, হয়তো আমার প্রাণ থাকলে চোখ দিয়ে পানিও পড়তো। কে জানে?

২০০৭ এর ১৬ নভেম্বর মাঝরাতে যখন ঘুর্নিঝড় সিডর হানা দেয়, তখন, কেবিনের একটা জানালা ভেঙে গিয়েছিলো, সেই রাতে কেবিনে একজন ভর্তি ছিলেন কিডনির সমস্যা নিয়ে। জানালা ভেংগে গিয়ে বাতাসের প্রবাহ এত বেশি ভেতরে আসছিলো কারও পক্ষে কেবিনে থাকা সম্ভব ছিলোনা, সেই রাতে কোনো কেবিন বা ওয়ার্ডও খালি ছিলোনা যে রোগী কে সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। পরে সেই রাতে হাসপাতালের ৪ তলায় একটা শেয়ারিং কেবিনের এক বেড খালি পাওয়া গিয়েছে শুনে তাকে সেই কেবিনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেদিনের পর মাঝে ১০-১২ দিন ৬০৯ নাম্বার কেবিন খালি পড়ে ছিলো, ঝড়ের কারণে ঘরে অনেক ধুলোও ঢুকে যায়, আসবাবপত্রেরও কিছু ক্ষতি হয়েছিলো, এরপর ১০-১২ দিন ধরে কেবিন পুনরায় পরিস্কার করে, আসবাবপত্র ও জানালার কাচ মেরামত করে ডিসেম্বরের শুরুতে আবার কেবিনে মানুষ থাকতে শুরু করে।

আরেকটি স্মৃতি প্রায় মনে পড়ে আমার। খুবই কষ্টদায়ক স্মৃতি। ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলো ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে। মায়াভরা একটা চেহারা ছিল মেয়েটার, কোথায় এই বয়সে হাসি আনন্দ করবে, ঘুরে বেড়াবে, জীবন গড়বে, সেই সময়ে মেয়েটা ক্যান্সারের সাথে লড়াই করছে, বেঁচে থাকার লড়াই। কিন্তু ডাক্তাররা পরীক্ষা করে বুঝে ফেলেছিলো যে ক্যান্সারের অনেক উপরের স্টেজে চলে গিয়েছিলো সে, বাঁচার আশা খুব ক্ষীণ। তবুও শেষ আশা নিয়ে হাসপাতালে আসা, এবং এই ৬০৯ নাম্বার কেবিনেই। মেয়েটার দুঃখ ছিলো অনেক, বাবা মার ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিলো ওর অল্প বয়সেই। দুইজনেই আবার আলাদা জায়গায় বিয়ে করে নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গিয়েছিলো, মেয়েকে মনে হয়না তারা কেউ চেয়েছে। বেচারী বড় হয়ে তার দাদী আর নানীর কাছে মিলিয়ে। দাদী নানি তাকে বড় করতে কোনো ত্রুটি করেননি, দুইজনে মিলে আলাপ করে নাতনির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতেন। দাদী নানীর মমতায় মেয়েটা বাবা মা এর ছাড়াছাড়ি হওয়ার কষ্টটা অনেকটাই সয়ে নিয়েছিলো। বছর খানেক আগে স্কুল থেকে অনেক জ্বর নিয়ে ফেরে সে, খুব দুর্বল হয়ে পড়ছিলো, প্রথম প্রথম ঠান্ডা লাগা জ্বর ভেবে থাকলেও, পরে জানা ডাক্তারের কাছে এসে জানা গেলো ক্যান্সারের কথা। ট্রিটমেন্ট সাথে সাথেই শুরু করা হয়েছিলো, দাদী নানী তাদের নাতনীকে সুস্থ করে তোলার জন্য যা যা সম্ভব করেছেন। কিন্তু মেয়ের অসুস্থতাতেও মন গলেনি তার বাবা মায়ের, এমনিতেই মুখ দেখাদেখি বন্ধ দুইজনের। নিজেদের সংসার নিয়ে ভালোই দিন কাটিয়ে যাচ্ছিলেন তারা। মেয়েটি মারা যাওয়ার মাস দুয়েক আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়, স্থান হয় এই ৬০৯ নাম্বার কেবিনেই। হাঁটতেই পারছিলোনা মেয়েটা ভালো মত, হুইল চেয়ারে করে কেবিনে নিয়ে আসতে হয়েছিলো। জীবনের শেষ সময়টুকুও নিঃস্বার্থভাবে মেয়েটির পাশে ছিলেন তার নানি ও দাদী। আজও মনে আছে তাদের দুইজনের কথোপকথনগুলো, তাদের ছেলেমেয়ের কৃতকাজের কষ্ট তাদেরও কম দেয়নি। প্রতিদিন কতবার দুইজনে ফোন করেছেন তাদের ছেলেমেয়েকে একবার হলেও যেন মেয়েটাকে দেখে যায় কিন্তু তাদের যেন আসার প্রয়োজনই মনে হয়নি। বাবা-মা এতটা স্বার্থপর হয় জানতাম না আগে কখনো। অবশ্য এসেছিলো তারা দুজনেই মেয়েকে দেখতে। ছিলোও কয়েকদিন মেয়ের সাথে এই কেবিনে। কিন্তু দুঃখের কথা, এই অবস্থাতেও মেয়ের সামনেও নিজেরা পুরনো অতীত টেনে ঝগড়া করা বাদ দেয়নি, মেয়ের হাজার অনুরোধ সত্ত্বেও, নীরবে মেয়ে চোখের পানি ফেলেছিল সেই দিনগুলিতে। জীবনের শেষ সময়টুকুতেও বাবা মা এমন করলো। ক্যান্সার ধরা পড়ার পর একটা ডায়েরিতে মেয়েটা প্রতিদিন তার কষ্টের কথা লিখে রাখতো, লিখে রাখতো বাবা মা কে না বলা কথাগুলো। হাসপাতালে সাথে করে ডায়েরিটা নিয়ে এসেছিলো। কেবিনে তার বেডের পাশে রাখা তাকের মধ্যে রেখে দিয়েছিলো ডায়েরিটা, শেষ দুইমাস এই কেবিনে থাকা অবস্থায় ডায়েরিটা এখানেই ছিলো, ওর লেখার শক্তি আর ছিলোনা। শুধু এইটুক মনে আছে আমার, মারা যাওয়ার ৩-৪ দিন আগে ডাক্তারকে ডায়েরিটা দিয়েছিলো সে, বলেছিলো তার কিছু হলে ডাক্তার যেন ডায়েরিটা তার বাবা মা কে দেয়। ডাক্তার সেই কর্তব্য পালন করেছিলো মেয়েটি মারা যাওয়ার পর ডায়েরিটা তার বাবা মায়ের হাতে দিয়ে। ঐ একবারই দুজনকে অনেকদিন পর একসাথে চোখের পানি ফেলতে দেখেছিলাম যখন ডায়েরিটা এই কেবিনে বসেই তারা পড়ছিলো মেয়ে মারা যাওয়ার পরে। আজও খুব মনে পড়ে মেয়েটার কথা।

দেখতে দেখতে এই হাসপাতাল ২৪ বছরে পা দিয়েছে এবছর, সেই সাথে আমিও। আজ আমি মানুষ হলে ২৪ বছরের এক প্রাণদীপ্ত তরুন হতাম। কিন্তু আমি হাসপাতালের কেবিন। কিন্তু তাতে কি? কত মানুষের স্মৃতি আছে আমার কাছে, আর নতুন কারও স্মৃতিও নিজের মধ্যে রেখে দেই। আজ পুরো পৃথিবী কয়েক মাস ধরে করোনাভাইরাসের থাবায় আক্রান্ত। বাংলাদেশও। প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে, চিকিৎসার জন্য আসছে হাসপাতালে। এখন ৬০৯ নাম্বার কেবিনে এক ডাক্তার কোয়ারেন্টাইনে আছেন যিনি করোনা রোগীর চিকিৎসা করছিলেন। সবসময়ে কাজের উপর থাকা এই মানুষটিকে কি পরিমান টেনশন আর ডিপ্রেসনে থাকতে হয় তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। ৩ দিন হলো এই কেবিনে আছেন তিনি একা। ডাক্তারি পেশার চেয়েও বড় পরিচয় আছে তার, একজন মা তিনি, যে কিনা নিজের ১ বছরের মেয়েকে বাড়িতে রেখে হাসপাতালে প্রতিদিন এসেছে করোনা রোগীদের চিকিৎসা করতে। চিকিৎসা করতে করতে কখন নিজের ভেতরেই করোনা পজিটিভ ধরা পড়েছে তা টেরও পাননি নিজে। এই তিন দিন একাকী আছেন এই কেবিনে, একাকীত্বে। মেয়ের সাথে যোগাযোগের একটাই উপায়, ভিডিও কল। ১ বছরের মেয়ে বুঝতে পারছে না কেন তার মা আসছেনা, কেন দূরে দূরে। কিন্তু কিছু তো করার নেই। ডাক্তার মা অজান্তেই চোখের পানি ফেলেন এই কেবিনে বসে, কখনো জোরেও কেদেছেন মেয়েকে কাছে নেওয়ার আকুলতায়। ভিডিও কলে অনুভব করেছেন মায়ের কোলে আসার জন্য মেয়ের আকুতি। উচ্চস্বরের কান্নাই তা জানায় দিচ্ছিলো বার বার। মেয়ের বাবা পারেনি তাকে সামলাতে। এমনই একদিন খুব শ্বাসকষ্ট হওয়ার এক পর্যায়ে দৃষ্টিভ্রমে অনুভব করেন মেয়েকে।

আগেই বলেছি আমি স্থাবর, প্রাণ নেই। সত্যি যদি কথা বলতে পারতাম, তাহলে উপরের স্মৃতিগুলোর মত আরও অনেক স্মৃতি বলতে পারতাম, এরকম একেকটা হাসপাতালের কেবিন, বাড়ি ছেড়ে যখন কেউ চলে যায়, তারা আমাদের জন্য রেখে যায় হাজারও স্মৃতি যা সারাজীবন আগলে রাখি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: