শহীদুল জহিরঃ একজন গল্পের মানুষ

কতোরকম মানুষ আছে জগতে। কত রকম তার ফন্দি-ফিকির। সব রহস্য তো উন্মোচিত হয় না। কেউ বুঝতে পারে, কেউ বা পারে না। তারপরও মানুষ অনেকরকম রং মেখে জগতে চলে বেঁচে থাকার জন্য। এই বেঁচে থাকাটা মানুষের অন্যতম চাহিদা। কিন্তু কেন মানুষ বাঁচে, তার কোনো সঠিক উত্তর কেউই দিতে পারে না।
গল্পকাররা গল্পের মাধ্যমে সেই বেঁচে থাকার কারণ গুলো বলেন। একটা একটা গল্প এক এক রকম করে সেটা আমাদের সামনে নিয়ে আসে। আমরা চমকে উঠি , আমাদের জীবনের আমাদের চেনা সেই অঙ্গন দেখে। কিন্তু এই যে জীবন কে দেখার আর তা বলার দৃষ্টি সেটা কত মাত্রিক আর বর্ণিল করে সামনে আসে, কত টা আড়াল আর গতি রাখে সেখানে গল্পকারের কৃতিত্ব।

আজ বাংলা ভাষার অনন্য গল্পকার শহিদুল জহিরের জন্মদিন। তবে কেবল বাংলা ভাষা না , আমার বিবেচনায় পৃথিবীর সব ভাষা মিলিয়ে ছোট গল্পকারদের যে কোন অভিজাত তালিকায় আমি তাঁকে রাখব। তাঁকে নিয়ে লিখবো লিখবো করেও এতদিন লেখা হয় নি। আজ কিছু কথা বলি তাঁকে নিয়ে। মানে তাঁর গদ্য নিয়ে। তাঁকে নিয়ে যেই কাজ আর আলোচনা হবার কথা, আমার মনে হয় আজও তাঁর কিছুই হয়নি। তবে কালে কালে পাঠক তাঁকে ঠিক চিনে নেবে, সেখানে একাডেমী বা পুরস্কারের রাজনীতি কোন কিছুই করতে পারবে না।

” … তবুও আমরা আরও একবার সমবেত হলাম,
আর আমাদের সময়ের মাধ্যমে একটি কুঁড়ি ফুলে পরিণত হয়,
একটি রূপালি রূপচাঁদা নোনা পানিতে ভাসে … ”

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তীকালে বাংলাদেশের ছোটগল্প পড়তে গেলে ঘুরেফিরে সেই চর্বিত-চর্বণই চোখে পড়ে বেশি। বিশেষ করে যুদ্ধোত্তর দেশের নানা সম্ভাবনা, যুদ্ধের ভয়াবহতা, শ্রেণিসংঘাত আর অভিশপ্ত জীবনের অপাঙক্তেয় আলেখ্য বেশি দৃশ্যমান এ দৃশ্যপটে। এছাড়া অন্যগল্প গুলো মানে আর যারা লিখেছে তেমন আলাদা কিছু না। গল্পকার যেন আসন পেতে বসেই আছেন গল্প শুনাবেন বলে। পাঠক এর কোন অপশন নেই। কিন্তু বেশিরভাগ গল্প এমন শিথিল অপরিপাট্য যে গল্পের মাঝপথে পাঠকের হাই ওঠে। যেন গল্পকার নিজেই নিজের গল্প ভুলে গেছেন।

সেখানে একেবারে নতুন করে নিজস্ব ভাষাবিন্যাস, গল্প বলার ধাঁচ থেকে শুরু করে অন্য রকম এক ভাবালেখ্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন শহীদুল জহির। তাঁর গল্পের মাঝে একটা স্পেস আছে, পাঠকের ভাবতে পারার, তাঁর গল্পে একটা আলাদা গতি আছে, যা পাঠক কে এক করে নিবে। আর সবচেয়ে যে জিনিস বেশি আছে তা ভাষার প্রয়োগ। সময় বহু মাত্রিক ভাবে তাঁর গল্পে আসে খুব সাচ্ছন্দে। তিনি যেন শীতের বারান্দায় বসে উদাসী অধ্যাপকের মত একটা নিয়তি বর্ণনা করে যাচ্ছেন। আর তাঁর নিজের উচ্ছাস বা শঙ্কা, তাঁর তাড়না বা বিদ্বেষ সব এক এক করে গল্পের চরিত্র গুলো শুষে নিয়ে যায়।

কথাসাহিত্যে যাদুবাস্তবতার যে ধারাটি গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এবং ল্যাটিন আমেরিকার সাহিত্যে ভীষণভাবে উপস্তিত তার ছায়া শহীদুল জহিরে রয়েছে – হ্যাঁ অনেকখানি এবং শুধু সে কারণেই শহীদুল জহিরের ভাগ্যে প্রশংসা কম জুটবে তা আমি মানতে নারাজ। উপস্থাপন অর্থাৎ উপন্যাসের ফর্মগত দিক থেকে বাংলা সাহিত্যে তো চিরকালই বিদেশি নতুন নতুন ধারায় আত্মস্থ হয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত সেখানে এ ব্যাপারটিতে উনিশ-বিশ ব্যতীত অন্য কিছু তো ঘটেনি। এবং শহীদুল জহির আমাদের সবার বাহবা পাবেন এজন্যই যে সম্পূর্ণ দেশীয় পরিপ্রেক্ষিতকে তিনি তাঁর নিজের ভাষায় উপন্যাসে গ্রন্থবদ্ধ করতে পেরেছেন। যাদুবাস্তবতা ধারার শৈলীগত বৈশিষ্ট্যের ছায়া তাঁর দুটো উপন্যাস থাকলেও তিনি সক্ষম পাঠককে তাঁর বিষয়ের গভীরে নিয়ে যেতে, পাঠকের মননে নতুন আলো ফেলতে এবং চেতনাকে আরো বেশি চকচকে করতে। “…A novel examines not reality but existence, and existence is not what has occurred, existence is the realm of human possibilities, every thing that man can become, every thing he’s capable of. Novelists draw up the map of existence by discovering this or that human possibility.” এক সাক্ষাৎকারে মিলান কুন্ডেরা একথা বলেছেন যা প্রকাশিত হয়েতে তাঁর The Art of the Novel গ্রন্থে।

তিনি মার্কেজের জাদুবাস্তবতায় কতটুকু বিশ্বাস করতেন, তাঁর গল্প পড়ে তা আমি বুঝতে পারিনি, অস্কার ওয়াইল্ডের লেখা তাঁকে কতটা প্রভাবিত করেছে কিংবা সেটা বলাও কঠিন। তবে পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে, হতাশা-অবক্ষয় কিংবা অহেতুক নৈরাজ্যবাদিতার ফ্রেম ভেঙে নতুন করে শৈল্পিক পাটাতন তৈরির কৃতিত্বটা তিনি অবশ্যই পাবেন।

ছোটগল্পকার শহীদুল জহিরকে চিনে নিতে গেলে সব গল্প পড়তে হবে এমন কোনো কথা নেই। তবে শুরু থেকে সেই গল্পগ্রন্থ ‘পারাপার’ (১৯৮৫), ‘ডুমুরখেকো মানুষ ও অন্যান্য গল্প’ (১৯৯৯), ‘ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প’ (২০০৪)—এগুলোর পাশাপাশি আবু ইব্রাহিমের মৃত্যু বইগুলোর পাতায় চোখ বুলালেই হবে। এদিকে ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’, ‘যে রাতে পূর্ণিমা ছিল’, ‘মুখের দিকে দেখি’ নামেও উপন্যাসগুলো চিনিয়েছে তাঁর জীবদর্শন ও ব্যক্তিসত্তা। এ ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠভাবে ফুটে উঠেছে বাস্তব-পরাবাস্তবের মাঝখানে থেকে যাওয়া অনিশ্চিত একটা শূন্যস্থান।

শহীদুল জহির জীবিত কালে খুব চুপচাপ আর নিভৃতে থাকতেই পছন্দ করতেন বলে পড়েছি। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হয় চিরকুমার, বন্ধু বিরল এই মানুষটি আসলে কল্পনার জগতে ঘুরে বেড়াতে খুব পছন্দ করতেন। তিনি গল্পে প্রতিটি চরিত্রকে একই সঙ্গে অন্তরঙ্গ ও দ্বান্দ্বিক অভিধায় চিত্রিত করেছেন। তিনি বিমূর্ত যে ভাষায় চিন্তার গভীর দ্যোতনা ও ভাবার্থের মেলবন্ধন ঘটানোর সাহস দেখিয়েছেন, তা বোধকরি আর কেউ দেখাতে দেখাতে পারেনি। বিশেষ করে চেনা গণ্ডির মধ্য থেকে অচেনা এক জগৎকে চিনিয়ে দিতে তাঁর পথ অনুসন্ধান অভূতপূর্ব। তাঁর গল্পে কোনো কাহিনীর সুনির্দিষ্টতা নেই, অহেতুক কোনো মেদও নেই সেখানে। তাই পাঠককে তাদের বোধের মধ্যে আটকে রেখে অন্য রকম পথ দেখিয়েছেন তিনি।

তাই শহীদুল জহিরের গল্প নিয়ে বাংলাদেশের অন্য কারো সাথে তুলনা করার সযোগ নেই, তিনি নিজে নিজেরই প্রতিদ্বন্দ্বী। আমি জানি যত দিন যাবে শহীদুল জহির আরও ঘন আর আপন হয়ে পাঠকের চেনা পরিমণ্ডলে উদ্ভাসিত হবেন।

জন্মবার্ষিকীতে তাঁর জন্য অনেক অনেক শুভেচ্ছা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: