সাহিত্য বাস্তবতায় নারীঃ একজন সাদাসিধে পাঠকের চোখে

১) জানি না এ কথা এই সময়ের সাহিত্যিকরা লক্ষ করেছেন কিনা, অথবা নতুন যুগের প্রেক্ষাপটে এ কথা এসেছে কিনা, কিন্তু মেয়েদের তুলে ধরার জন্য মেল গেইজের (Male gaze) নেহাত উপরিতলের লঘু দৃষ্টি — যেটা আকছার সমাজ তৈরি করেছে, সেটা পালটানো দরকার।

মহিলাদের কাছে যা তাদের আপন সুনিবিড় জটিল বাস্তবতা, যা নিয়ে সমাজ ভাবিত না, অনেক মহিলাও যা টের পাননি, কারণ সে গভীরতায় যেতে চাননি বা পারেননি — সেটা রায়হীন অর্থে জানার বিষয়, একটা প্রগতি-ভাবাপন্ন সুস্থ সমাজের।

২) সাহিত্যে ও সাহিত্যিক বাস্তবতায় মেয়েদের সত্যিকারের গল্পের কোনো চিত্রিত রূপ আকছার মেলে না। মেল গেইজকে খুশি করার জন্য লেখা তৈরি হয়। এমন খুব বেশি লেখা ইদানিংকালে পাইনি, যেখানে বাংলা অক্ষরে আমাদের জীবনের শ্বাস আর আকাঙ্ক্ষা, নিদেনপক্ষে অনুভূতি ও সার্থকতার সজীব অবয়ব বিম্বিত হতে দেখেছি। মুক্তিযুদ্ধের লেখাগুলি বাদ দিয়ে। সেসব আরো হলে কে জানে কী হত, মেয়েদের অক্ষরে। সেখানে মেয়েরা কিন্তু অন্য এক সম্মান নিয়ে সামনে হাজির হয়ে গেছে, এমনি এমনি। তত্ত্ব হাজির করতে হয়নি।

কবিতা, গদ্য বা উপন্যাসে অতিরিক্ত উগ্রতা বা ব্যগ্রতায় কাত হয়ে না পড়ে, ভাষার তামাক-গন্ধে আবিল না হয়ে গিয়ে সত্য গেঁথে নেবার কাজ পেলে ভালো লাগত।

৩) শুধু নির্যাতিত নিগৃহীত আর পীড়িত স্টিরিওটাইপ হিসেবে মহিলাদের দেখছি না – কারণ তা খন্ড করে দেখা, যদিও সেটা বাদ দিয়ে নিটোল জীবনের ছবি হয় না, আর যদিও গড়পড়তা সামাজিক চোখের মধ্যে মহিলাদের স্টিরিওটাইপিং-এর সবটুকু লেন্স নিহিত আছে।

৪) ভিক্টিম মেন্টালিটি বা পলায়নবাদিতা, এই দুই অবস্থাই লেখা বা পড়ার জন্য অনাবিল জায়গা না। লেখা ও পড়ার মধ্যে আবিলতা থাকলে সেটা পাঠককে জানতে হবে – এটা নেশা, এটা আত্মার পুষ্টি নয়।

বহিরাঙ্গের gloss, বাইরের চমক আর ঠার, সুপিরিয়রিটি বা ইনফিরিয়রিটি — এসবই আবিলতার জায়গা।

৫) একটা চরিত্র আঁকা হবে, যেটা মানুষের বোধবুদ্ধি ও আত্মাকে তীরের মত স্পর্শ করবে। সেরকম কোনো লেখা ও ছবি আমি চট করে মনে করতে পারি না। অথচ বাস্তবতাকে যদি দেখি, সেই রকম লেখা ও ছবি সব সময় পাওয়া যায়। সাহিত্যিকের কাজ অন্যের বাস্তবতাকে ভিতরে বাইরে বুঝে ফেলা।

আচ্ছা, এবার ভেবে দেখি যে সমাজে এম্প্যাথির চর্চা নেই, বরং মানুষ যেখানে উগ্র বিরক্ত চড়চড়ে আর শিথিল, যেখানে হাতাহাতি থেকে সম্পর্কগুলো এক হাত দূরে, সেখানে এরকম সাহিত্য পয়দা হবে কোথা থেকে?

৬) গত দুই দশক ধরে আমি সামান্য যে সংগ্রাম করেছি যা হয়ত অনেকে করেননি, স্থানিক কালিক ও নানাবিধ কারণেই, সেই সংগ্রাম শতভাগ নিজের স্বভাব খুঁজে ফেরার সংগ্রাম, এর এতগুলো স্তর আছে যা আমি লেখা দিয়ে বুঝিয়ে উঠতে পারি না, সে ভাবে বেঁচে থাকা বা ভেসে থাকা, বিরূপ প্রতিবেশে নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, গ্রাসাচ্ছদনের জন্য — যা বিশ্বজনীন হলেও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষ রূপ ধারণ করে, ভিক্টীম হিসেবে জালে জড়িয়ে পড়ার পরে সে জাল কাটা, তারপর ভিক্টিম কথাটাকে ভিতর থেকে বোঝা, পাখির ছানার ডানা গজানোর আপ্রাণ সংগ্রাম, ফুস্ফুসের বাতাস খোঁজা আক্ষরিক এবং বৃহত্তর অর্থে, অনেক সময় স্থানকালপাত্রে অধরা থেকে যাওয়ার বেদনা, না হতাশার সঙ্গে কাটাকুটিতে আস্থাকে ডেকে আনা, খুঁজে ফেরা, ব্যথায় নিজেকে নিজেই শুশ্রূষা, ব্যান্ডেজ আর সান্ত্বনা, শিশুদের নিয়ে চুম্বক দিকনির্দেশনায় একনাগাড় লেগে থাকা, অশান্তির মধ্যে শান্তিরূপেন সংস্থিতা ইত্যাদি রূপ পরিগ্রহ করার একটা ভঙ্গুর প্রচেষ্টা, বেদনার মধ্যে আত্মস্থ থাকা, কারণ নিরুপায় বাজ খেয়ে পোড়া গাছও দাঁড়িয়ে থাকে, জীবনের প্রতি বিশ্বাস নামের তামাদি ব্যাপার টিকিয়ে রাখা। এই সব নানা ইন্টারেস্টিং স্নায়বিক সংগ্রাম কি এক পয়সাও কম করে দেখতে পারা যায়? পারে কি কেউ? যে গল্পগুলো হয়ে উঠেছে তাদের শব্দরূপ কোথায়?

এমন আরও গল্প আছে, সাহিত্যিকদের সেই গল্পগুলো চেনার সাহস দরকার।

৭) একটা জিনিস বলতে পারি – এখানে জবরদস্ত সত্যতার সঙ্গে বসবাসের শক্তি লাগে। এখানে মাঝেমাঝে ভারি ক্লান্তি আসে। একজন ভালো সাহিত্যিক এই সব টের পেলে এখান থেকে অনেক অনেক মালমসলা পেতেন। এর খোসা আঁশ রঙ আর ঘ্রাণ সব কিছু বের করে আনতে পারতেন — স্বচ্ছতা বলে একটা জিনিস আছে, সাহিত্যে যার প্রয়োজন আছে।

৮) তেমন তেমন ভালো সাহিত্যিক বা লেখক নেই তাও নয়। ভাষার কারিগরী খুব বেড়ে আছে। শব্দ-শিকারীর সঙ্গে উপরিতলের ইন্দ্রিয়গোচর পারসেপশনের যোগসূত্রের জেলে-মাছ সম্পর্ক খুব দাঁড়িয়ে গেছে। জাদুকরের মত শব্দ নিয়ে খেলা অনেক দেখা যায়।

৯) কিন্তু গভীর জলে জেলের জাল পৌঁছয় না, ডুবুরি লাগে। নিজেকে নামতে হয় অতল জলে, যেখানে চেনা আলোর রোশনাই পৌঁছয় না, পারসেপশন, আবেগ বা অনুভূতিরও গহীন স্তর। তামাদি মেটিফোর ব্যবহার করে বললে, সেখানে মণিমুক্ত থাকে।

১০) মেয়েদের (অর্থাৎ সব মানুষের কারণ মেয়েদের আলাদা জীবন বলে কিছু নেই, মেয়েদের জন্মদাগ নিয়ে যে পুরুষ জন্মায়, তাদের অবুঝ জীবনে জমা থাকে সব মেয়ের অনুক্ত উপন্যাস) সুপারফিশাল জীবন আর অস্তিত্বটাকে মনোহারী দোকানের মত মেলে ধরে যদি পাঠক আকর্ষণ করতে হয় তবে “দিল্লী বহুদূর”।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: