ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কাশ্মীর সমীকরণ

একটা পর্যবেক্ষণ এমন হতে পারে যে, ইতিহাসে কেবল ন্যায্যতার শক্তি দিয়ে কোন কিছুর নির্ধারণ হয় না। সেই ন্যায্যতাকে বাস্তবে রূপায়ন করার জন্য শক্তির ভারসাম্য খুব বড় বিষয়, ঘটনাপ্রবাহ অনুকূলে থাকলে যেমন দৈত্যও ধরাশায়ী হয়, প্রতিকূলে থাকলে ক্ষুদ্র কাউকে গ্রাস সামান্যই আলোড়ন তোলে।

কাশ্মীরের পক্ষে শক্তির ভারসাম্য হয়তো এই মূহুর্তে এত বিপুল নয় যে, যে আপন ন্যায্যতাকে বাস্তবে রূপও দেবে। কিন্তু কাশ্মীরের অন্তর্গত শক্তি এত ক্ষুদ্রও নয় যে, তাকে আরামে গ্রাস এবং আত্মস্থ করা ভারত রাষ্ট্রের পক্ষে অনায়াস-সাধ্য কাজ হবে।

কাশ্মীরের মানুষের সংগ্রাম তাই প্রলম্বিত হবে তাতে সন্দেহ নাই। কিন্তু যে সংগ্রাম জারি থাকে, সে প্রতিনিয়ত শক্তিমানের আগ্রাসী জুলুমের প্রমাণ হিসেবেও উপস্থিত থাকে।

ভারতের মত বৈচিত্রময় রাষ্ট্র ও সমাজে কাশ্মীরগ্রাস সিকিম গ্রাসের মত হবে না সম্ভবত। বরং বহু রকম আন্তর্জাতিক নীতিকৌশলের ছকে সে ব্যহৃত হবে, ভারতের মাঝেও স্থানীয় বহু রকম সংগ্রামেও তার প্রভাব বহুভাবে দেখা যাবে।

আপাতত দেখাই যাচ্ছে, ভারতে খুশী মোদী বাহিনী। কারণ ভারতের হ্যাডম তারা দেখাতে পেরেছে। খুশী ভারতীয় পুঁজি, বিনিয়োগের নতুন দ্বার খুলেছে। ক্ষুদ্ধ কারা? বড় একটা অংশ নিশ্চিতভাবেই ধর্মীয় পরিচয়গত একাত্মতার সূত্রে। একই ধরনের বা কাছাকাছি ধরনের নির্যাতন তারা হয়তো অন্য একটা মুসলিম রাষ্ট্রে সহ্য করবেন। আরও একটা বড় অংশ এমনকি ভারতীয় অসাম্প্রদায়িক ও উদারপন্থী রাজনীতিও, তাদের উদ্বেগের দিকটা হলো এর মধ্য দিয়ে ভারতের বৈধতা ও ন্যায্যতা বিপুল পরিমানে ক্ষুণ্ণ হয়েছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রে একটা প্রলম্বিত যুদ্ধাবস্থাকে নিশ্চিত করা হয়েছে। সম্ভবত ক্ষীণ হলেও তাদের এই আশা ছিল যে, আগে হোক পরে হোক, কাশ্মীর ধীরে ধীরে ভারতে রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং অর্থনীতিতে আত্মীকৃত হয়ে যাবে মন্থর এবং মাঝারি কিন্তু স্থায়ী একটা বলপ্রয়োগেই। তৃতীয়ত ক্ষুদ্ধ এবং দারুণ উদ্বিগ্ন হয়েছে আরও অনেকগুলো রাজ্য ও জনগোষ্ঠীর মানুষেরা। কারণ ভূমিকে কেন্দ্র করে কাশ্মীরের মতই একই রকম সুরক্ষার আইনী অধিকার তারা এতদিন ধরে পেয়ে আসছিলেন। এবার ভারতীয় এবং বহুজাতিক পুঁজির জন্য সেইখানে অনুপ্রবেশ আরও সহজ হবে; ভূমির ওপর অধিকারই আদতে যে কোন নিপীড়িত বা হুমকির সম্মুখীন সংস্কৃতির আত্মরক্ষার সবচেয়ে বড় জায়গা। নিজের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে যখন একটা সমাজে পুঁজির বিকাশ ঘটে, সে অনুপ্রবেশকারীর দ্বারা প্রভাবিত হলেও কমবেশি নিজের স্বত্ত্বাকে টিকিয়ে রাখতে পারে। তা না হলে তাকে প্রবল গ্রাসের মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি বাংলাদেশেও আদিবাসীদের ভুমির অধিকার সংরক্ষণের গণতান্ত্রিক শক্তির অনুপস্থিতি বহু জাতিসত্ত্বার সংস্কৃতিকে বিপন্ন করে তুলেছে। সর্বশেষে, আপাতত বড় প্রশ্ন না হলও রাজ্যগুলোকে ভাঙা এবং নতুন নতুন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল তৈরি করার এই দৃষ্টান্তও ভবিষ্যতে ব্যবহৃত হতে পারে রাজ্যগুলোকে বশে আনার জন্য, সেটাও ভবিষ্যতে একটা দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশ এই প্রশ্নটিকে ‘পর্যবেক্ষণ করছে’, কারণ আসলে জনমতের বিরুদ্ধে কিছু বলার যেমন সাহস তার নেই, তেমনি বৃহৎ প্রতিবেশীর নিন্দা করার মুরোদও নেই। পাকিস্তানের জন্য এটা বিশাল একটা রাজনৈতিক দ্বৈরথের ডাক, নিজেরা ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির মুখোমুখি হয়েও, এবং আপাতত অক্ষম ও অকার্যকর জেনেও তারা বিরোধিতাতেই নেমেছে। সম্ভবত তারাই একমাত্র রাষ্ট্র, আজন্ম রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে তাদের কাছে প্রশ্নটা খুবই তীব্র। চীনের ভূমিকাটা লক্ষ্যণীয়, তারা মৃদু বিরোধিতা করেছে, কিন্তু ভারতের সাথে কোন বাণিজ্যিক ঝামেলায় যাওয়ার ঝোঁক তারা কিছুতেই দেখাবে না। কিন্তু প্রবল সম্ভাবনা থাকলো, এই প্রশ্নটাকে তারা ভবিষ্যতে ব্যবহার করতে পারে ভারতে ভয় দেখাতে কিংবা বশে রাখতে, কেননা বিপরীতটা করার শক্তি ভারতের আপাতত নেই। চিনের মুখপত্র গ্লোবাল টাইমসে চোখ বোলালে ভারতকে চীন কতখানি গুরুত্ব দেয়, তা বোঝা যাবে। পত্রিকাটির একটা অংশ মার্কিনের নিন্দামূলক এবং অন্য একটি অংশ ভারতের ইতিবাচক পর্যালোনায় বরাদ্দ থাকে, এটা নিয়মিত আয়োজন। এই দুই ব্যতীত অন্য কোন রাষ্ট্র এই গুরুত্ব পায় না।

স্থুল শক্তি দিয়ে দমন দুনিয়া জুড়ে বহু আছে, যেগুলো দীর্ঘস্থায়ীও হয়েছে। চীনের তিব্বত গ্রাস যেমন একটা উদাহরণ, তেমনি আছে পাকিস্তানেও ছোট ছোট অনেকগুলো এমন অঞ্চল, যেগুলো ১৯৪৭ এ আঞ্চলিক সায়ত্বশাসন ভোগ করতো, পরবর্তীকালে তাদের ধীরে ধীরে গ্রাস করা হয়। প্রতিটি রাষ্ট্রেই নানান বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনও আমরা দেখেছি, সেগুলোর ন্যায্যতা-বৈধতা নিয়ে বহুমুখী সমর্থন কিংবা বিরোধিতা থাকলেও এদের কোনটি কাশ্মীরের মত আলোচিত হয়নি। কারণ কাশ্মীর একটা চুক্তির লঙ্ঘন, যা ভারত নিজে সম্পাদন করেছিল কাশ্মীরের জনগণের সাথে। নৈতিক বৈধতার প্রশ্ন যদি আসে, কাশ্মীর প্রশ্নে ভারত সম্পূর্ণরূপে পরাজিতের দলে। এই পরাজয়ের মূল্য কম নয়, তা ইতিহাসে বারংবার দেখা গিয়েছে। বাস্তব রাজনীতির প্রশ্ন যদি আসে, শেষ বিচারে কী ঘটবে, তা কাশ্মীরের জনগণের মনোভঙ্গির ওপর যেমন নির্ভর করবে, তেমনি নির্ভর করবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপ্রকৃতির ওপরও।

কাশ্মীরের জনগণের আকাঙ্ক্ষা অবিনাশী হোক।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: