জীবনানন্দের দুটো কবিতা: মৌলিকতার প্রশ্ন

 সত্যজিৎ রায়ের আকা জীবনানন্দের বনলতা সেন

বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলে থাকেন, ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ও অধ্যাপক কবি জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) তাঁর বিখ্যাত ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি রচনা করেছিলেন মার্কিন কবি এডগার অ্যালেন পো (১৮০৯-১৮৪৯)’র ‘টু হেলেন’ কবিতাটি অনুসরণে, এবং আরেক প্রখ্যাত কবিতা ‘হায় চিল’ ইংরেজ কবি উইলিয়াম বাটলার (ডবিøউ. বি.) ইয়েটস (১৮৬৫-১৯৩৯) ‘দা কার্লিউ’র অনুসরণে।

এ কথা সত্যি হলে কিন্তু স্বীকার করতেই হবে যে, ভাবগাম্ভীর্য, কাব্যিক সৌন্দর্য, কল্পনার বিস্তার, উপমা-উৎপ্রেক্ষার উৎকর্ষ, ইতিহাস চেতনার ব্যাপকতা ইত্যাকার সবদিক থেকেই জীবনানন্দের কবিতা দুটি পো ও ইয়েটসের কবিতা দুটির চেয়ে অনেক বেশি ভালো। এ ক্ষেত্রে যেন অনুসৃতকে অনেকগুণ ছাড়িয়ে গেছে অনুসরণকারী। কবিতাগুলো পাশাপাশি রেখে বিচারের জন্যে পাঠকদের সামনে এগুলো তুলে ধরলাম, পো’র ‘টু হেলেন’ এবং ইয়েটসের ‘দা কার্লিউ’র মূল ইংরেজি পাঠ ও বাংলা অনুবাদসহ।

এডগার অ্যালেন পো ‘টু হেলেন’ কবিতাটি লেখেন তাঁর এক বাল্যবন্ধুর মা জেন স্ট্যান্ডার্ড-এর স্মরণে। কবিতাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৩১-এ ‘পোয়েমস অব এডগার এ. পো’ নামের সঙ্কলনে। এটা পুনর্মুদ্রিত হয় সাহিত্য সাময়িকী ‘সাউদার্ন লিটারারি মেসেঞ্জার’-এর মার্চ ১৮৩৬ সংখ্যায়। কবিতাটি সংশোধন ও পরিমার্জনের পর চূড়ান্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় পো’র কাব্যগ্রন্থ ‘দা র‌্যাভেন অ্যান্ড আদার পোয়েমস’-এ।

অন্যদিকে, জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি প্রথম প্রকাশ করেছিলেন কবি-কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু তাঁর ‘কবিতা’ পত্রিকায়। জনপ্রিয়তম বাংলা কবিতাগুলোর অন্যতম এই কবিতাটি পাঠকের কাছে পৌঁছে ১৯৩৫-এর  ডিসেম্বরে প্রকাশিত ‘কবিতা’ পত্রিকার পৌষ, ১৩৪২ সংখ্যার মাধ্যমে। জীবনানন্দ ১৯৪২-এর ডিসেম্বরে তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থও প্রকাশ করেন ‘বনলতা সেন’ নামে এবং বইটির প্রথম কবিতা হিসেবে কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত করেন।

এডগার আ্যলান পো

তার মানে, পো’র ‘টু হেলেন’ এবং জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’-এর রচনাকালের পার্থক্য প্রায় শতবছরের। কবিতাদ্বয়ের দিকে এবার দৃষ্টিপাত করা যাক–

TO HELEN

Helen, thy beauty is to me
Like those Nicéan barks of yore,
That gently, o’er a perfumed sea,
The weary, way-worn wanderer bore
To his own native shore.

On desperate seas long wont to roam,
Thy hyacinth hair, thy classic face,
Thy Naiad airs have brought me home
To the glory that was Greece,
And the grandeur that was Rome.

Lo! in yon brilliant window-niche
How statue-like I see thee stand,
The agate lamp within thy hand!
Ah, Psyche, from the regions which
Are Holy-Land!

বাংলা অনুবাদে–

হেলেনকে

হেলেন, আমার চোখে সৌন্দর্য তোমার
সেই কবেকার নিসীয়* বল্কলের মতো,
ক্লান্ত, পথশ্রান্ত পরিব্রাজক ধীরে ধীরে সুরভিত
সাগরের পথে নিয়ে আসে যারে স্বদেশে তাহার।

কতদিন আহা ঘুরছি উত্তাল সাগরে সাগরে
তোমার শ্যওলা চুল, তোমার ধ্রæপদী মুখ,
জলপরী রূপ ডেকে আনে গ্রিসের গৌরবে,
রোমের মহিমায় আমাকে নিজ ঘরে।

ওই তো দূরে আলোকোজ্জ্বল জানলার ধারে
মর্মরমূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছো তুমি
রতœদীপ হাতে যেন দেবী কোনো স্বর্গভূমি
হতে নেমে এলে এই পৃথিবীর পারে।

*নিসিয়া হলো খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের রোমান সা¤্রাজ্যের বিথিনিয়া রাজ্যের একটি শহর। আধুনিক তুরস্কের অন্তর্গত এ শহরের বর্তমান নাম ইজনিক।

বনলতা সেন
জীবনানন্দ দাশ

হাজার বছর ধ’রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দু-দণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।

চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা,
মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য; অতিদূর সমুদ্রের ’পর
হাল ভেঙে যে-নাবিক হারায়েছে দিশা
সবুজ ঘাসের দেশ যখন সে চোখে দেখে দারুচিনি-দ্বীপের ভিতর,
তেমনি দেখেছি তারে অন্ধকারে; বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন
সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;
পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন
তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;
সব পাখি ঘরে আসে– সব নদী— ফুরায় এ-জীবনের সব লেনদেন;
থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।

কবিতা দুটো পাশাপাশি পড়লেই বোঝা যায়, মেজাজের দিক থেকে কাছাকাছি হলেও, ‘বনলতা সেন’-এর তুলনায় ‘টু হেলেন’ অনেক নিরাবরণ, নিরাভরণ। ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি শুধু আয়তনেই বড় নয়, চেতনার বহুধাপ্রসার, মগ্নচৈতন্যের অলিগলিতে অনাবিল সঞ্চরণ, অসামান্য আবহনির্মাণ প্রভৃতি সবদিকেই অতিক্রম করে গেছে ‘টু হেলেন’-কে। সবচেয়ে বড় কথা, ‘বনলতা সেন’ ষোলআনার ওপর আঠারো আনা হিসেবে একটা বাংলা কবিতা হয়ে উঠতে পেরেছে।

‘বনলতা সেন’ কবিতায় অবশ্য আরো একটি বিখ্যাত ইংরেজি কবিতার ছায়াপাত দেখা যায়, এবং সেটা হলো কবি জন কিটসের ‘On First Looking into Chapman’s Homer’। এ কবিতার শুরুর কয়েকটি পংক্তি–

Much have I travelled in the realms of gold,
And many goodly states and kingdoms seen;
Round many western islands have I been
Which bards in fealty to Apollo hold.

বাংলা ভাষান্তরে-
অনেক ঘুরেছি আমি সুবর্ণ অঞ্চলে,
দেখেছি অনেক রাষ্ট্র, রাজ্য শুভময়;
পশ্চিমে অনেক দ্বীপে গেছি আমি চলে
যেথা অ্যাপোলোর স্তব চারণেরা গায়।

এই পংক্তিগুলোর সঙ্গে ‘বনলতা সেন’-এর শুরুর পংক্তিগুলো মেলালেই কিছুটা সাদৃশ্যের বিষয়টি সুস্পষ্ট হবে, যদিও তারপরও স্বীকার করে নিতে হবে জীবনানন্দের স্বকীয়তা আর অনন্যতার কথা।

এবার আসা যাক ‘দা কার্লিউ’ ও ‘হায় চিল’ প্রসঙ্গে।  ১৯২০ থেকে ১৯২২-এর মধ্যে ইয়েটসের লেখা কবিতাটার আসল নাম ‘হি রিপ্রুভস দা কার্লিউ’ (He Reproves the Curlew)। কম্পোজার পিটার ওয়ারলক এই কবিতাটি এবং ইয়েটসের আরো তিনটি কবিতার সমন্বয়ে একটি ‘সঙ্গীত চক্র’ রচনা করে তার নাম দেন ‘দা কার্লিউ’। পরে এর অন্তর্ভুক্ত প্রথম কবিতা ‘হি রিপ্রুভস দা কার্লিউ’ সংক্ষেপে ‘দা কার্লিউ’ নামে উল্লিখিত হতে থাকে।

ইয়েটসের কবিতাটি এবং তার একটি মোটামুটি নির্ভরযোগ্য বাংলা অনুবাদ দেখা যাক:

The Curlew

O CURLEW, cry no more in the air,
Or only to the water in the West;
Because your crying brings to my mind
passion-dimmed eyes and long heavy hair
That was shaken out over my breast:
There is enough evil in the crying of wind.

বাংলায়:

হে চাতক

হে চাতক, তুমি আর কেঁদো না বাতাসে,
অথবা শুধু পশ্চিম সাগরের জলের বিস্তারে;
কারণ তোমার কান্না আমার হৃদয়ে নিয়ে আসে
ভাবাবেগে ¤øান তার চোখ আর দীর্ঘ কেশভারে
ঘেরা মুখ, যার ছোঁয়া পেয়েছিলো আমার এ বুক।
বাতাসের কান্নাতেই এমনিতে যথেষ্ট অসুখ।

এবার পড়া যাক জীবনানন্দের ‘হায় চিল’ কবিতাটি:

হায় চিল

হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে!
তোমার কান্নার সুরে বেতের ফলের মতো তার ম্লান চোখ মনে আসে!
পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো সে যে চলে গেছে রূপ নিয়ে দূরে;
আবার তাহারে কেন ডেকে আনো ? কে হায় হৃদয় খুঁড়ে
বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!

হায় চিল, সোনালি ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে
তুমি আর উড়ে উড়ে কেঁদো নাকো ধানসিড়ি নদীটির পাশে!

দুই ভাষ্যের মধ্যে তুলনা করলেই বোঝা যাবে, জীবনানন্দ ইয়েটসের কবিতার প্রেরণায় ‘হায় চিল’ রচনা করলেও, তাতে যোগ করেছেন নতুন অনেক অনুষঙ্গ, যেমন– ‘সোনালি ডানা’, ‘ভিজে মেঝের দুপুর’, ‘ধানসিড়ি নদী’, ‘বেতের ফলের মতো’, ‘রাঙা রাজকন্যা’, ‘হূদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানো’; সবশেষে প্রথম পংক্তিদ্বয়কে পুনরাবৃত্ত করিয়ে কবিতার বাণী ও উপলব্ধিতে একটি ঘুরন্ত অন্তহীনতার আবহ তৈরি করলেন কবি।

একজন সুন্দরীর প্রেমে পড়ে যেমন নতুন কবিতা লেখা যায়, তেমনি এক নিটোল কবিতার প্রেমে পড়েও অনুরূপ আরেকটি নতুন কবিতা রচনা করা যায়, যা মৌলিকত্বের দাবিদার হতে পারে। ইয়েটসের কবিতাটি থেকে জীবনানন্দ যদি প্রভাবিত বা অনুপ্রাণিত হয়েও থাকেন, তিনি তাকে নিজের করে নিয়েছেন সৃষ্টিশীলতার বিবর্তিত নবায়নে। আর আমরা জীবনানন্দের কবিতাটিকে নিজের করে নিয়েছি আমাদের পৌনঃপুনিক পাঠ-বয়ানে। শ্রেষ্ঠ শিল্পের এ-ও এক কূটাভাস। কবিতাটি এখন ইয়েটস হয়ে জীবনানন্দ হয়ে আপনার আমার সবার।

প্রভাবিত হোক আর যা-ই হোক, ‘বনলতা সেন’ আর ‘হায় চিল’ যে অত্যন্ত সুন্দর, শিল্পোত্তীর্ণ দুটো খাঁটি বাংলা কবিতা, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: