শহীদুল্লাহ কায়সারঃ ৭১ এর হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী

‘আজ এই ঘোর রক্ত গোধূলীতে দাঁড়িয়ে
আমি অভিশাপ দিচ্ছি তাদের
যারা আমার কলিজায় সেঁটে দিয়েছে
একখানা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ’
-—শামসুর রাহমান

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত থেকে পাকিস্তানী বাহিনী বাঙালী নিধনযজ্ঞে মেতে ওঠে। শহীদুল্লা কায়সার এই সময়ে ঢাকাতেই আত্মগোপন করে ছিলেন। তিনি অনেককে ভারতে চলে যেতে সাহায্য করেছেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করার জন্য নিজে দেশ ত্যাগ করেননি। তাঁর দেশ ত্যাগ না করার আরও একটি কারণ মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ চিত্র নিজে প্রত্যক্ষ করে তা ইতিহাসে বিধৃত করতে চেয়েছেন।

২৫শে মার্চের পর প্রথম রাতেই শহীদুল্লাহ কায়সার তার স্ত্রীকে নিয়ে বেরিয়েছিলেন শহর দেখতে। জগন্নাথ হলে গিয়ে লাশ সামাল দিয়েছিলেন আরো অনেকের সঙ্গে। সেই প্রসঙ্গে পান্না কায়সার লিখেছেন ..

“ও যখন আমার কাছে ফিরে আসলো, ওর শার্টে রক্তের দাগ দেখে আমি চিৎকার করে উঠেছিলাম। সেদিন আমি চিৎকার করে বলেছিলাম-এ শার্ট তুমি খোল, আমি সহৃ করতে পারছিনা। সেদিন তো আমি এর উল্টোটিও বলতে পারতাম-এ শার্ট আমি রেখে দেবো, রক্তের দাগ মুছতে দেবো না। শহীদের রক্ত যে এতো পবিত্র সেদিনের ক্ষীন বুদ্ধি দিয়ে আমি তা বুঝতে পারিনি। বাসায় ফিরে শার্টটি আমি ধুয়ে ফেলেছিলাম। আজো এ কথা মনে হলে আমি নিজেকে ঘৃণা করি। এক অজানা শহীদের রক্তের দাগ আমি মুছে ফেলতে চেয়েছিলাম, অথচ আমরা শহীদের ছোপ ছোপ রক্ত আমার হৃদয়ে বয়ে চলেছে! ”

“আইয়ুব খান আমাকে জেলে পাঠিয়েছিলেন, তাই আমি সাহিত্যিক হতে পেরেছি।’

এই উক্তি যিনি করেছিলেন, তিনি শহীদুল্লাহ কায়সার। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বসেই তিনি লিখেছিলেন ‘সারেং বৌ’ নামের বিখ্যাত উপন্যাসটি। যেটির জন্য তাঁকে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়। শহীদুল্লা কায়সারকে তিন পর্যায়ে আট বছর বন্দিজীবন কাটাতে হয় এবং এই দীর্ঘ সময়ে পড়াশোনা ও সাহিত্যচর্চা করেছেন নিবিষ্ট মনে। ‘সারেং বৌ’, ‘রাজবন্দীর রোজনামচা’, ‘সংশপ্তক’ ছাড়াও কারাগারে বসে তিনি অধিকাংশ গল্প-উপন্যাস রচনা করেছেন।

১৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা। পুরান ঢাকার কায়েতটুলির বাসায় শহীদুল্লাহ কায়সার মোমবাতি জ্বালিয়ে বিবিসি শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে তিনি ভাবলেন মুক্তিযোদ্ধারা এসেছে। তিনি আলমারি খুলে টাকা বের করলেন মুক্তিযোদ্ধাদেরকে দেওয়ার জন্য। কিন্তু দেখলেন কারা যেন মুখ লাল কাপড়ে বন্ধ করে ঘরে ঢুকল। তারা ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞাসা করল, ‘শহীদুল্লা কায়সার কে?’

শহীদুল্লাহ কায়সার এগিয়ে এসে বললেন, ‘আমিই শহীদুল্লা কায়সার। এরপর তারা তাকে নিয়ে যেতে চাইলে পরিবারের লোকজনের হাজার বাঁধা দিয়েও আটকাতে পারেন নি তার যাওয়া। যাবার সময় স্ত্রী ও বোনের দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বলেছিলেন, ‘ভাল থেকো’। কারফিউ-এর অন্ধকারে তিনি চিরকালের জন্য হারিয়ে গেলেন। তাঁর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এমনকি তাঁর মৃতদেহও পাওয়া যায়নি।

মেয়ে শমী কায়সার তখন মায়ের কোলে শুয়ে ফিডারে দুধ খাচ্ছে। আসেনি ফিরে শহীদুল্লাহ কায়সার বদর বাহিনি কেড়ে নিয়েছিল শহীদুল্লাহ কায়সারের প্রাণ।

আপনাদের আত্মদান আজ ব্যর্থ। আপনার দেখা নতুন ভোরের স্বপ্ন এখন বিলুপ্ত, এ বাংলা আজ পুর্ব পাকিস্তানের থেকেও আরও প্রতিক্রিয়াশীল।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: