কিভাবে পড়ার অভ্যাস তৈরী করবেন

 

আপনি হয়ত কখনোই বই পড়তে পছন্দ করেন না, ইদানীং মনে হচ্ছে একটু পড়াটড়া দরকার। অথবা আমার মত কখনো নিয়মিত পড়তেন, আজকাল কাজের চাপে বা অন্যান্য কারণে পড়া হচ্ছে না কিন্তু চান পড়তে। তাহলে এই লেখাটি আপনার জন্য
আপনি যদি প্রচুর পড়েন নিয়মিত, বা পাঠ্যবইতে কীভাবে মনোযোগ দিতে হয় সেটা জানতে চান তাহলে এই লেখাটি আপনার জন্য নয়
আমি মোটেও গুরুগিরি করার চেষ্টা করছি না। নিজের বই পড়ার অভ্যাস পুনরুদ্ধারের সময় কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি।

 

পড়ার সুবিধা-অসুবিধা

পড়ার একটা সুবিধা ও অসুবিধা হচ্ছে আপনি পড়ছেন। অসুবিধা কারণ ভিডিও বা গানের মত সুর ও চিত্র আপনি পাচ্ছেন না। সুবিধা এই কারণে যে আপনি অনেকটা কল্পনা করে নিতে পারবেন। এমন তো প্রায়ই হয় বই পড়ার পর মুভি ভালো লাগে না অথবা বই বাজে লেগেছে, মুভি খুব ভালো। কারণ এটাই। কখনো আপনার কল্পনাকে মুভিমেকিং ছাপিয়ে যায়, কখনো মুভিমেকিং আপনার কল্পনার ধারেকাছেও আসতে পারে না।
পড়ার আরেকটা সুবিধা হচ্ছে পড়া আপনার গতিতে চলে। অর্থাৎ, আপনি থেমে, বুঝে, হজম করে পরের অংশে যেতে পারেন।

 

পড়ার অভ্যাস

পড়া (এবং ভালো জিনিস পড়াও) ভালো গান শোনা, ভালো মুভি দেখার মত acquired taste. অর্থাৎ, অভ্যাসটা রপ্ত করতে হবে। আমি পুনরায় পড়াশোনা শুরু করার সময় প্রায়ই আমার ধৈর্যচুতি হত। এই সময়টা কঠিন, তখন একটু কষ্ট করে আরেকটু পড়তে হয়। জ্যাজ্ বা ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিকাল, এমনকি অনেক ভালো পরিচালকের মুভিও ভালো লাগবে না যদি ভালো লাগার মত ওই বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকে। এজন্য একটু উদার হতে হয়। না, যা করছে সব ভালো বলে বাহবা দিতে বলছি না, অন্ততঃ নিউট্রাল হয়ে খানিকটা এগিয়ে যান।
নিয়মিত হোন। চেষ্টা করুন রোজ কিছুটা সময় বের করতে। পড়তে চাইলে সময় বের করা আসলে কঠিন না। লাঞ্চ আওয়ারে খেতে খেতে, যাদের রোজ অফিসে যেতে আসতে ঘন্টাখানেক করে সময় লাগে তাদের বাসের সিটে বসে পড়া হতে পারে। বাসায় ঘুমের আগে একঘন্টা পড়া যেতে পারে।

 

ভালো বইয়ের খোঁজ

ভালো বইয়ের খোঁজ নিন গুডরীডসে। শুধু রেটিং দেখে লাভ নেই, প্রচুর ইয়ং অ্যাডাল্ট আর মাসুদ রানাও ভালো রেটিং পায়। কয়েকটা রিভিউ, ভালো ও নেগেটিভ দুটোই পড়বেন। মোটামুটি ধারণা হয়ে যাবে। কেউ কোনো বই পড়তে বললে টুকে রাখুন, পরে রিসার্চ করুন পড়বেন কিনা। সময় তো অফুরন্ত না। এতটুকু জীবন আর এত এত ভালো বই! বাজে জিনিস পড়ার ফুসরত কই?

 

বই সংগ্রহ

খুব ভালো হয় পাইরেসি না করে বই কিনলে। কিন্তু হয় কি, সবসময় সব বই পাওয়া যায় না অরিজিনাল ভার্সন। এমনকি আজিজ মার্কেটেও অরিজিনাল বলে নীলক্ষেত ভার্সন চালিয়ে দেয়। না পেলে ওগুলোই পড়েন। বিদেশি বই হলে ইবুক সহজে পাবেন, দেশি বইয়ের পিডিএফ (ওটাকে ইবুক বলতে মন খচখচ করে)।
অনুবাদ এড়িয়ে চলুন যতটা সম্ভব। ইংরেজি যারা পড়তে পারেন ফ্লুয়েন্টলি বা এমনকি যথেষ্ট ফ্লুয়েন্ট না তারাও কিছুদিন পড়লে ইংরেজিতে পড়া অভ্যাস হয়ে যাবে। অনুবাদে বইয়ের স্বাদ হারিয়ে যেতে থাকে। আর স্প্যানিশ, ফ্রেঞ্চ এরকম ভাষার বই বাংলায় সাধারণত ইংরেজি থেকে অনুবাদ হয়, তাতে আরো হারিয়ে যায়। নিরুপায় না হলে মূল ভাষাতে পড়ুন, নাহলে একদফা অনুবাদে।
বই সবচেয়ে সস্তা বিনোদনগুলোর মধ্যে একটা। সিনেপ্লেক্সের একটা টিকিটের দামে তিনগুণ সময় ধরে উপভোগের মত একটা বই কেনা যায়।

 

কাগজের বই বনাম ইবুক

“বইয়ের একটা গন্ধ আছে”, “আমার হাতে নিয়ে পড়তে ভালো লাগে” ইত্যাদি ইত্যাদি… আপনার সেন্টিমেন্টকে আমি অ্যাকনলেজ করছি (আমার অনেক এমপ্যাথি) কিন্তু সমর্থন করতে পারছি না। কাগজের বই মানে কাগজ, মানে গাছ কাটা। তাছাড়া বহনযোগ্যতা ইবুকের চেয়ে কম।
যারা ইবুক বলতে পিডিএফ বোঝেন তাদের মন এখনো খচখচ করছে। কিন্তু, ইবুক যদি হয় মোবি বা ইপাব তাহলে কিন্তু অন্যরকম বিষয়। মোবি ও পিডিএফ ফোন ও ট্যাবে এবং ডেস্কটপে সবকিছুতেই আরামে পড়া যায়। বিশ্বাস না হলে একটা ইপাব বা মোবি Moon+ reader এ ওপেন করে দেখুন। পছন্দের ফন্ট থেকে ফন্ট সাইজ, কালার, ব্যাকগ্রাউন্ড সবকিছু মনমত করা যায়।
ইবুক পড়ার আরেকটা সুবিধা হচ্ছে নোটস্, হাইলাইটস্ সব সুন্দরভাবে গুছিয়ে রাখা যায় বইয়ের বারোটা না বাজিয়েই। আর গুগল প্লে বুকস্-এ পড়লে তো আপনার নোটস্ ও হাইলাইটস্ সুন্দর করে গুগল ড্রাইভে সাজিয়ে রাখবে।

 

বইয়ের রকম-সকম

সাধারণত নন-ফিকশন ও ফিকশন এই দুই ভাগে বইকে ভাগ করা যায়। পাঠক হিসেবে এটা আমার খুব একটা কাজে লাগে না। যেমন, অটোবায়োগ্রাফির গল্প কখনো ফিকশনের চেয়েও ভালো হয়। কেন পড়ছি তার ওপর ভিত্তি করে আমি বই দুইভাগে ভাগ করি।

১। প্লেজার বুকস্: যেসব বই আপনি আনন্দ পেতে পড়েন, নতুন কিছু জানা এখানে গৌণ।

২। টেকনিক্যাল বুকস্: যেসব বই আপনি জানতে পড়েন, আনন্দ এখানে গৌণ।

অবশ্য, আনন্দ বোধহয় কখনই গৌণ হয় না। টেকনিক্যাল বইয়ের ক্ষেত্রে জানার আনন্দটা থাকে।

 

কীভাবে পড়বেন?

প্লেজার রিডিঙের ক্ষেত্রে, কাটাছেঁড়া-ক্রিটিসিজম দ্বিতীয়বার পড়ার সময় রাখবেন। প্রথমবার থেকেই ক্রিটিসিজম করতে করতে অনেক লিটারেচারের ছাত্রের লিটারেচার থেকে মন উঠে যায়। বইয়ের গতিতে গা ভাসিয়ে দিন।
টেকনিক্যাল রিডিং ধীরেসুস্থে করতে হয়। কোনো কনসেপ্ট না বুঝলে গুগল করুন, আরো জানুন সেটা নিয়ে। তাড়াহুড়োর কিছু নেই।
উভয় ক্ষেত্রেই মন চাইলে নোট রাখুন, হাইলাইট করুন। কাগুজে বই হলে হাইলাইট না করাই ভালো, পরে যারা পড়ে তাদের অসুবিধা হয়, স্টিকি নোট বা নোটবুক ব্যবহার করতে পারেন। ইবুকে সে সমস্যা নেই অবশ্য।
টেকনিক্যাল বই হলে, “বইয়ে লেখা, নিশ্চয়ই সত্য” এমন ধারণা করবেন না। যাচাই করুন।
বই মুখস্ত করার চেষ্টা করবেন না। ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক, গুরুত্বপূর্ণ জিনিস মনে রাখার জন্য নোট আছে।
স্পীড রিডিং পরিহার করুন, ওটা পড়া না, শো অফ।

 

বইয়ের রিভিউ

কোনো বই ভালো লাগলে রিভিউ লিখতে চেষ্টা করবেন। কখনো পাবলিশ না করলেও যদি রিভিউ লেখেন তাহলে বইটার বিষয়ে আপনার অনুভূতি গুছিয়ে রাখা যায়। আর পাবলিশ করলে খেয়াল রাখবেন স্পয়লার না হয়ে যায়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: