থ্রি ইডিয়টস মা কি কাহানী

অরিত্রী হত্যা নিয়ে এখন মানুষ ভাবছে। এর আগে চৈতি নামেও ভিকারুন্নেসার একটি কিশোরী শিক্ষকদের অসদাচরণে আঘাত পেয়ে আত্মহত্যা করেছিল। নৈতিকতা ও সহমর্মীতাহীনতার দ্বন্দ্বে পরে এভাবে হাজার হাজার প্রাণ ঝরে যায় কিংবা বিপথে যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নৈতিকতা ও পার্থিব জ্ঞান দানের অসুস্থ প্রতিযোগিতার পরাকাষ্ঠায় পরে মানবিকতা হারানোর এই সময়ে একটা ছবিকে প্রাসঙ্গিক মনে করছি। ছবির নাম In Which Annie Gives It Those Ones । এই ছবিটা থ্রি ইডিয়ট টাইপের। তবে এর কাহিনী বেশ শক্তিশালী। একে আসলে “থ্রি ইডিয়ট কি মা কি কাহানী” বলা চলে।

১৯৮৯ সালে কয়েকটি শাখায় ভারতের জাতীয় পুরষ্কার জিতে নেয় এই ছবিটি। কি আছে এ ছবিতে? ছবিতে আছে কয়েকটি চমক। শাহরুখ খান এ ছবিটির মাধ্যমেই মুম্বাই চলচিত্র জগতে পা রেখেছিলেন। ছোট্ট একটি রোলে কয়েক লাইন মাত্র ডায়ালগ ছিল তার। ছবির প্রধান তিনটি চরিত্রের মধ্যে একটিতে অভিনয় করেন বিখ্যাত লেখক অরুন্ধুতি রায়, যিনি এই ছবির গল্প ও স্ক্রিন প্লে লিখেছেন। তরুণ ও উদীয়মান এই লেখকের এটিই ছিল প্রথম স্ক্রিন প্লে, এবং প্রথম কাজেই তিনি জাতীয় পুরষ্কার পেয়ে যান নিজ ক্যাটাগরিতে। নাম ভূমিকায় ছিলেন অর্জুন রায়না এবং আরেকটি শক্তিশালী চরিত্রে ছিলেন ভারতের জনপ্রিয় টিভি ও মঞ্চাভিনেতা ঋতুরাজ সিং।

গল্পটা খুব মজার। দিল্লীর ন্যাশনাল আর্কিটেকচার ইন্সটিটিউটের ফাইনাল ইয়ারের একটি ব্যাচ এর পরীক্ষার ঠিক এক সপ্তাহ আগে সবাই টেনশনে, এরকম একটি পরিস্থিতি দিয়ে কাহিনী শুরু। সবাই যার যার প্রজেক্ট ও প্রেজেন্টেশন তৈরিতে ব্যস্ত। ক্লাসে এনি নামে একটি নীরিহ গোছের ছেলে থাকে যে জঙ্গল ও পশু পাখি খুব ভালবাসে। সে মনে করে স্থাপত্য বা ঘরবাড়ির নকশা এমন হওয়া উচিৎ যাতে প্রকৃতি এবং প্রকৃতিতে বসবাসরত কোন প্রাণীর যেন ক্ষতি না হয়। কিন্তু কলেজের এবং বিভাগীয় প্রধান প্রিন্সিপাল তার এই মনোভাবকে অবাস্তব ও রোমান্টিক মনে করে এবং সব সময় তাঁকে নিয়ে মজা করে। মজা এমন পর্যায়ে যায় যে ছেলেটি প্রিন্সিপালের গুড বুকে আর থাকেনা। টুকটাক তাদের মধ্যে ঝামেলা লেগেই থাকে। ছেলেটি ক্ষমা চাইলেও স্যার ক্ষমা করেন না। ছেলেটি নিজের রুমে মুরগী, খরগোশ ইত্যাদি পালন করে এবং তার ডিম বিক্রি করে কিছু টাকা আয় করে, যা নিয়ে হলের সবাই মজা পায়। একবার এনির মুরগী হারিয়ে যায় তাঁর রুম থেকে, পরে দেখা যায় তার পাশের রুমের তারই দুইজন সহপাঠী সেই মুরগীর বার্বিকিউ পার্টি করছে। এনি তার কল্পনা ও আইডিওলজি অনুযায়ী তার প্রজেক্ট বানানোর চেষ্টা করে। সকলে যেখানে কার্ডবোর্ড, কাঠ ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে ভারী নকশা করে উপস্থাপন করে সেখানে এনি শুধু একটি কাগজে তার নকশা উপস্থাপন করে ক্লাসের শেষ দিন। প্রিন্সিপাল সেটা দেখে রেগে যান এবং বলেন যে এনি ফাইনাল প্রেজেন্টেশনে কোনভাবে পাশ করতে পারবেনা। সে খুব চিন্তায় পরে যায়।

এদিকে ছেলেটি যেহেতু চরম বোহেমিয়ান গোছের, তার প্রতি সহমর্মী হয়ে ওঠে তার ক্লাসের দুইজন মেধাবী বন্ধু রাধা ও অর্জুন। রাধা ও অর্জুন ঠিক করে যে করেই হোক এনিকে পাশ করাতেই হবে। তারা নিজেদের প্রজেক্টে কাজ করার পাশাপাশি এনিকেও ডেকে নেয় এবং তার প্রজেক্টে সাহায্য করে। সারা দিন রাত খেটে তারা নিজেদের এবং এনির প্রজেক্ট দাড় করায়। তবে এখানে রাধার চরিত্রটিও অদ্ভুত। ধূমপায়ী, পশ্চিমা পোশাক ও জীবনাচরণে অভ্যস্ত রাধার জীবনের লক্ষ্য লেখক হওয়া। দৈবক্রমে সে স্থাপত্যে পড়তে আসে সুযোগ পেয়ে। সে তার ফাইনাল প্রেজেন্টেশনে আধুনিক স্থাপত্য বিদ্যার অপ্রয়োজনীয়তা নিয়ে এক লম্বা লেকচার দিয়ে বসে। এক্সটারনাল শিক্ষকরা তার যৌক্তিক কিন্তু আবার অবাস্তব কথায় অবাক হন, তবে তাঁকে ফেল করায় না। তার পোশাকও ছিল ঐদিন অদ্ভুত। শাড়ির পাশাপাশি সে হ্যাট পরে। আসলে এই অদ্ভুত পোশাক পরা ছিল সে ও তার বন্ধু অর্জুনের প্লানের অংশ যাতে রাধার পরেই ডাক পাওয়া এনির প্রতি শিক্ষকদের ইতিবাচক ধারণা জন্মায়। তাদের দুজনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এনি শিক্ষকদের রুমে প্রেজেন্টেশন দিতে যাবার ঠিক পরপরই এক্সটারনাল শিক্ষকদের পাশে বসে থাকা প্রিন্সিপালের টেলিফোন কল আসে। প্রিন্সিপাল কল এটেন করতে রুম ত্যাগ করেন। এই ফাকে এনি নিজের প্রেজেন্টেশন শেষ করে।

যেদিন ফলাফল ঘোষণা হয়, সেদিন সবাই অবাক হয়। দেখা যায়, এনি অনেকের চেয়েও বেশি মার্ক্স পেয়ে বসে। রাধা পাশ করেই খুব খুশি। অর্জুন স্বাভাবিকভাবেই টপার হয়। কিন্তু এনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ অনুভব করে। সে নিজের প্রজেক্ট উপস্থাপন না করতে পেরে খুবই মর্মাহত হয়। সবাই যখন এনিকে খুঁজছে তখন তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়না। অনেকক্ষণ পরে দেখা যায় সে একটি আইনের মোটা বই বগলে করে, মাথা ন্যাড়া করে ফিরে আসছে। ন্যাড়া মাথায় প্রজাপতি আর সাপ আঁকা। সে জানায় সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে স্থাপত্য ছেড়ে দিয়ে আইন নিয়ে পড়াশুনা করবে এবং প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে মামলা করবে।

বেশ কয়েক বছর বাদে দেখা যায়, ঐ প্রিন্সিপাল অবসর গ্রহণ করেছেন। এনি ঐ বিভাগেই প্রফেসর হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়। এভাবেই সিনেমটি শেষ হয়।

এর মানে আসলে কি দাঁড়ালো। নৈতিকতা ও ঔচিত্যবোধের কোন স্ট্যান্ডার্ড হয় না। পৃথিবী, জীব ও জগতের ক্ষতি হয় এবং মানবিকতার অপমান করে নৈতিকতা ও মান চর্চা করা যায়না। মানবিকতা, সহমর্মীতা ও জীবনের দাবি অবহেলা করা সবকিছুর জন্যই ক্ষতিকর। আমাদের তথাকথিত শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে অনেকগুলো ছবি আছে। তবে বাংলাদেশে এখনও সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। বলিউডে থ্রি ইডিয়ট ছাড়াও আছে, অমিতাভ ও সাইফের আরাকশন, তেরি জামিন পার, উমা, বাবার নাম গান্ধীজী ইত্যাদিসহ আরও অনেক।

ছবিটি দেখতে পারেন এখানেঃ

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: