অরিত্রী অধিকারীর মৃত্যুঃ আত্মহত্যা নাকি হত্যা?

এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও শিক্ষার প্রয়োজন আছে, শিক্ষকদেরও। ভিকারুননিসা নূন বিদ্যালয়ের অরিত্রি অধিকারী নামের মেয়েটির আত্মহত্যার ঘটনায় অনেকগুলো অপরাধ, ত্রুটি, পদ্ধতিগত ভুল এবং বাতিল শিক্ষা দর্শনের সমাহার আমরা দেখতে পেয়েছি।

১. শিক্ষার্থী নকল করছে মানে ঢাকার অন্যতম বিখ্যাত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ত্রুটিপূর্ণ।

২. নকল করার শাস্তি বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার? টিসি বা ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নামের উপনিবেশিক আমলের ভয়াবহ শাস্তির আতঙ্কে আমাদের দেশে শিক্ষার্থীরা এখনও ভোগেন, এই ঘটনায় তা আবারও কেবল সামনে আসলো। বিদ্যালয় কি বিচারিক ক্ষমতা রাখে? না। আইনগতভাবে সাবালক নন এমন কাউকে শাস্তি দেয়া যায়, কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানোর মত চরম অপরাধ ছাড়া? না।

৩. শিক্ষার্থীর কোন ভুলের জন্য অভিভাবকদের ডেকে অপমান করার মত কুৎসিৎ প্রথাটিও দেশে এখনও অব্যাহত আছে।

৪. বিদ্যালয়গুলোতে কেন মনোবিদের এ্কটা স্থায়ী পদ থাকবে না? দুই দশক আগেও শিশুরা যতটা যৌথ, পারিবারিক ও পাড়তো পরিবেশে থাকতো, তার অনেকখানিই নতুন সামাজিক চাহিদা ও পরিস্থিতিতে বিলুপ্ত হয়েছে। ফলে তার দায়িত্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আগের চেয়ে বেশি নিতে হবে। এই চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঢেলে সাজাতে হবে।

৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তাদের মনোভঙ্গির আমূল পরিবর্তনের জন্যও জাতীয় ভিত্তিতে পর্যালোচনা ও ব্যবস্থা গ্রহণের বন্দোবস্ত করতে হবে। শিক্ষক আমলা নন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কারাগার না, এই বিষয়টা তাদেরকে বোঝাবার ব্যবস্থা করতে হবে সবার আগে।

বাংলাদেশে প্রতিবছর সড়কে বিপুল আহত-নিহত হওয়াটা যেমন কোন দুর্ঘটনা নয়, কেননা ব্যবস্থাগত লুণ্ঠন-অরাজকতা-ব্যবস্থাপনার অভাব-অবহেলাই এই সব হতাহতের জন্য দায়ী, সেই জন্য আমরা তাকে বলি কাঠামোগত হত্যা। এক একটি কাঠামোগত হত্যাকাণ্ডের পেছনে আসলে থাকে অজস্র প্রকাশ না হওয়া কিন্তু প্রতিদিন ঘটে যাওয়া অজস্র ক্ষয়ক্ষতি।

ভিকারুননিসা নূন নামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে অরিত্রের মৃত্যুটাকেও আমরা সাধারণ কোন আত্মহত্যা হিসেবে নিতে প্রস্তুত নই। এই আত্মহত্যাটি আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আমাদের ছেলেমেয়েরা কোন দশায় শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করছেন।

এবং মনে রাখতে হবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের দায়িত্ব শিশুকে শিক্ষা দেয়া, চাপ সহ্য করার সক্ষমতা অর্জনে সহায়তা করা। কিন্তু সকল নাগরিকের দায়িত্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কঠোর সামাজিক দায়বদ্ধতার মাঝে রাখা। তাদেরকে সময়-পরিবেশ ও চাহিদা অনুযায়ী রূপান্তর ও সংস্কারের মধ্য দিয়ে যেতে বাধ্য করা প্রয়োজন।

শিক্ষককেও প্রতিদিন শিক্ষিত হতে হয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: