তোতাকাহিনীর পরে

আজ থেকে প্রায় ১০১ বছর আগে মাঘ মাসে রবীন্দ্রনাথ নামের প্রায় পৌনে সাতান্ন বছর বয়সী এক প্রৌঢ় কবি ঘোষণা করেছিলেন, “পাখিটা মরিল। কোন্‌কালে যে কেউ তা ঠাহর করিতে পারে নাই।” কেউ যে ঠাহর করতে পারেনি সেটা অবশ্যই ঠিক কথা না, কবিবর বিলক্ষণ ঠাহর করতে পেরেছিলেন। বলেছিলেনও। তার কাব্যময় কাহিনী প্রশংসা পেয়েছে বিস্তর, কিন্তু ঠাহর আমরা আসলেই করতে পারিনি। তাই, ১০১ বছর পরে অরিত্রী নামের পাখিটা আবারও ‘মরিল’। আমরা ‘অদ্যপি ঠাহর করিতে পারি নাই।’

শিশুরা নিশ্চয়ই দুধে ধোয়া তুলসীপাতা না। তারা অন্যায় করে, মিথ্যা বলে, আরো অনেকরকম দোষই করে। মারাত্মক অপরাধও কেউ কেউ করে। তবু, কোনো সভ্য দেশের আইনে শিশুদের অন্যায় বা অপরাধ বড়দের সাথে একই মানদণ্ডে বিচার করা হয় না। কেন হয় না? কারণ, শিশুটি এই সমাজে শিক্ষানবিশী। সে শিখছে, কী করতে হয় আর কী করতে হয় না। সমাজের লক্ষ্য শিশুটিকে শেখানো, তাকে শাস্তির জন্য শাস্তি দেয়া না। তাই, খুন করে ফেললেও শিশুদের ফাঁসি হয় না। আধুনিক সভ্য শিক্ষাব্যবস্থায় শাস্তির ধারণাটাই তুলে দেয়া হয়েছে। আমাদের দেশেও শারিরীকভাবে শাস্তি দেয়া আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। মুশকিল হয়েছে, আমাদের যত ‘এক হাতে কলম এক হাতে সড়কি’অলা পণ্ডিত আছেন সেই মহাশয়দের। তাদের পীড়নকামিতা চরিতার্থ হচ্ছে না ঠিকমত। তাই বোধ করি তারা মানসিক পীড়নের মোক্ষম অস্ত্র যত্রতত্র যথাসাধ্য ব্যববহার করে থাকেন।

শিশু, বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালের ছেলেমেয়েদের সাথে কী আচরণ করা উচিত, তা ওই প্রিন্সপাল মহাশয়ার অজানা, তা বলার উপায় নেই। মাস্টারি করতে গেলে ওসব জানতে হয়। কিন্তু, জানলেই বা কী! এই দুর্ভাগা দেশের ‘বুদ্ধিজীবীর রক্তে-স্নায়ুতে সচেতন অপরাধ’1। তারা এইসব হত্যাকাণ্ড জেনেশুনেই করেন। তাদের ভিতরে এক ভীষণ পিশাচ বসবাস করে। শিশুদের প্রাণ মাঝে মাঝে সংহার না করলে এই পিশাচের শান্তি হয় না। সেই যে এক কচ্ছপ এক শিয়ালপণ্ডিতের কাছে তার বাচ্চাদের পড়তে দিয়েছিল, শিয়াল তাদের একটা করে খেয়ে ফেলত, আর যেগুলো থাকতো সেগুলোকে বারবার দেখিয়ে দিত; আমাদের দশা হয়েছে সেইরকম। এই পিশাচসিদ্ধ শিয়ালপণ্ডিতদের কাছে আমরা আমাদের সন্তানদের বর্গা দিয়ে আসি, তারা তাদের সবসময় প্রাণে না মারলেও মরমে মেরে ফেলে। আর দুএকটি জিপিএ ৫ কচ্ছপের ছানা বারবার করে দেখিয়ে নিজেদের বিদ্যে জাহির করে। আমরা বোকা কচ্ছপের দল মনে মনে খুব খুশি হতে হতে আর নয় ঈর্ষায় জ্বলতে জ্বলতে আমাদের মৃত সন্তানের চলন্ত দেহটি নিয়ে বাড়ি ফিরি। তাদের মধ্যে এই অরিত্রীর মত কেউ কেউ সেই দীর্ঘকালীন মৃত্যুকে প্রত্যাখ্যান করে এই পৈশাচিক শিক্ষাযজ্ঞকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে যায়। তখন আমরা একটু নড়েচড়ে বসি, কান্নাকাটি করি, তারপর শিশুসন্তানটির কচি হাতটি ধরে আবারও সেই শেয়ালের কাছে বর্গা দিয়ে আসি।

মান্যবর বন্ধুগণ, ১০১ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “…গান তো বন্ধই, চিৎকার করিবার ফাঁকটুকু পর্যন্ত বোজা। দেখিলে শরীরে রোমাঞ্চ।” ১০১ বছর পরে, বিবর্তনের ধারায় আমরা এহেন গণ্ডার জাতিতে পরিণত হয়েছি, আমাদের কোনো রোমাঞ্চ-টোমাঞ্চ হয় না। সন্তানের মৃত্যুতেও আমরা টলি না। আকাশ, বাতাস, ফুল, পাখি, হাসি, আনন্দ, শৈশব– কোনোকিছুরই কোনো দাম নেই আমাদের কাছে। আমরা কেবল একটি জিনিস চিনি, জানি এবং বুঝি। টাকা।

এইটিই হলো আমাদের সমাজের এক্কেবারে গোড়ার সমস্যা। প্রিয় প্রিয় মান্যবর বন্ধুগণ, আমাদের সন্তানরা আমাদের ত্যাগ করতে শুরু করেছে। আমাদেরকে, আমাদের সমাজ, সভ্যতা, শিক্ষাদীক্ষা, জীবন সমস্তকিছু ত্যাগ করতে শুরু করেছে। আমাদের এই অন্ধত্বের কোনো মানে হয় না। জীবনানন্দ নামে আরেক কবি রবীন্দ্রনাথের অনেক দিন পরে বলেছিলেন, “আমাদের সন্ততিও আমাদের হৃদয়ের নয়”। সেই কথাই আমাদের সন্তান, অরিত্রীরা বারবার জীবন দিয়ে প্রমাণ করে যাচ্ছে, তারা আমাদের হৃদয়ের নয়। তাদের আমরা ভালবাসি না, তাদের সুখদুঃখ-অভিমান আমাদের আত্মায় লাগে না। তারা আমাদের আত্মজ নয়। আমরা কেবল আমাদের আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করি তাদের ঘাড়ে চেপে। তাদের জন্যে আমাদের যত শুভাকাঙ্ক্ষা, যত উপচীকীর্ষা সব আসলে ফাঁকি, মেকি। তারা আমাদের অহং, আমাদের আত্মতুষ্টির বাহন মাত্র।
আমাকে মার্জনা করবেন। সন্তানের মৃতদেহ সামনে নিয়ে নিরাবেগ বিশ্লেষণ করার মত অমানুষিক ক্ষমতা আমার নেই। যে দেশের বাতাসে শিশুদের কান্না ভেসে বেড়াবে, যে দেশের আকাশের দিকে শিশুরা মাথা তুলে তাকানোর ফুসরত পাবে না, যে দেশের শিক্ষকেরা– শিক্ষক, ভালবাসতে শেখানো যার মৌলিক কর্তব্য মনে করি, সেই শিক্ষকেরা যখন বাক্যবাণে আমাদের সন্তানদের হত্যা করবে, সেই দেশের প্রতি আমার, সেই দেশের শাসকের প্রতি আর সেই দেশের মান্যবর নাগরিক আর বুদ্ধিজীবীদের প্রতি আমার কণামাত্র শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি নেই। এমনকি আমার নিজের প্রতিও। “আমিও ভণ্ড অনেকের মত, গান দিয়ে ঢাকি জীবনের ক্ষত”2। ইনিয়েবিনিয়ে কান্নাকাটির কোনো মানে নেই আজ আর। এই পীড়ন, এই মৃত্যু চলতে যদি থাকে, রক্ষা নেই কারো।

  1. রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
  2. কবীর সুমন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: