স্বাধীন দেশে কেমন আছে সূর্য সেনের বংশ

সূর্য সেনদের গুষ্টির শেষজনকেও শেষপর্যন্ত গ্রাম ছেড়ে পাশের দেশে পাড়ি দিতেই হলো।

সূর্যবাবুর নিজের ছেলেপিলে বলতে তো কিছুই ছিলো না। তিনি নিজে তো ফাঁসির দড়িতে ঝুলে ইহলীলা সাঙ্গ করলেন। স্ত্রী পুষ্পকুন্তলা তারপর কোথায় হারিয়ে গেলেন কে জানে?

কাজেই, চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়ার সেনপাড়ায় নিজের গাঁয়ে তাঁর ভিটেটা আগেই হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিলো। সেখানে কিছু গ্রাম্য টাউট-বাটপার ঘুঘু চরাচ্ছিলো।

এদিকে, সূর্য সেন বিপ্লবটা করেছিলেন ভুল সময়ে, ভুল দেশে। তিনি নিজে শহিদ হয়ে ‘মহাবিপ্লবী’ হয়ে গেলেন, যদিও তাঁর লাশটা পর্যন্ত পাওয়া গেলো না।

ওদিকে, তাঁর বিপ্লবের ষোল বছর পর তাঁর স্বদেশ যখন স্বাধীন হলো, তখন তা দ্বিখণ্ডিত। আর তাঁর জন্মগ্রামটি এই দুখণ্ডের যে-খণ্ডে পড়েছে, মাস্টারদা তার কথা তাঁর মহাবিপ্লবের স্বপ্নেও কখনো ভাবেননি।

তাই বলা চলে, মহাবিপ্লবীর স্বাধীন স্বদেশের স্বপ্ন পূর্ণ হলো বটে, কিন্তু তা এমনভাবে হলো, যা আসলে এক দুঃস্বপ্ন, যা আদৌ না-হলেই ভালো হতো।

সে-স্বাধীনতার প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসেবে শুরু হয়ে গেলো, পাইকারি হারে সেন বংশীয়দের দেশত্যাগ। অবশ্য শুধু সূর্য সেনের গুষ্টির লোকেরা নয়, সমৃদ্ধ, স্বর্ণপ্রসূ নোয়াপাড়া গ্রামের, মোগল যুগের বিখ্যাত ‘পরগনে নোয়াপাড়া’র মোক্ষদা রায়দের বাড়ি, মহাকবি নবীন সেনদের বাড়ি, রক্ষিতদের বাড়ি, দাসবর্মণদের বাড়ি ইত্যাকার বিশাল বিশাল সব বনেদি বাড়িগুলো জনশূন্য হতে শুরু করলো। বাঘ-সিংহদের সেসব বাড়িঘর, জমিজমা দখল নিতে শুরু করলো শেয়ালরা।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাড়িগুলো দখলে গেলো আগের মালিকদের বর্গাচাষী, লেঠেল প্রভৃতির হাতে। সংখ্যগুরুত্ব বা সরকারি দলের জোরে তারা নামমাত্র মূল্যে কিংবা একেবারে বিনামূল্যেই সেসব বাড়ি-জমির দখল নিয়ে নিলো।

সে-ধারা অক্ষুণ্ণ রইলো পরবর্তী অর্ধশতকেরও বেশি সময় ধরে। ইতোমধ্যে সূর্য সেনের স্বদেশ আরো একদফা স্বাধীন হলো। তাতে লাভের মধ্যে এটুকু হলো যে, আগেকার স্বাধীনতার পরেরকার সিকিশতাব্দী ধরে তাঁকে বিপ্লবী বলার চেয়ে ডাকাত বলতেই তৎকালীন সরকার যেখানে বেশি পছন্দ করেছে, দ্বিতীয় দফা স্বাধীনতার পর তাঁর মান-ইজ্জত কিছুটা বাড়লো। যে-শহরে তিনি মহাবিপ্লব করেছিলেন, প্রথম দফা স্বাধীনতার পর তাঁর স্বদেশের অন্য অর্ধাংশে পালিয়ে যাওয়া তাঁর সহবিপ্লবীরা আবার সে-শহরে এসে মহাসমারোহে তাঁর আবক্ষ ব্রোঞ্জ মূর্তি উন্মোচন করলেন লোহার শিকের বেড়ার ভেতরে। সবাই ধন্য ধন্য করতে লাগলো।

তবে দুর্মুখ দুষ্টজনেরা বলাবলি করতে লাগলো, মরে গিয়েও সূর্য সেন রেহাই পেলেন না লোহার শিকের ঘেরাটোপ থেকে।

তবে সে-দুঃখটাও কিছুটা ঘুচিয়ে দিলেন তাঁর এলাকা থেকে নির্বাচিত ‘মাটি ও মানুষের দল’-এর একজন সাংসদ। থানা সদরের কেন্দ্রস্থলে তিনি আরো একটা আবক্ষ মূর্তি বসালেন মাস্টারদা’র, এবং এটাকে ঘিরে কোনো লোহার শিকের ঘেরা দেয়া হলো না।

কিন্তু তাতেও তো রেহাই নেই! দুনিয়ার যত ভিখারি, বাউণ্ডুলে, নেশাখোররা তখন আড্ডা জমালো ছোট্ট ছাউনির নিচে, মাস্টারদার মূর্তির তলায়। অচিরেই মূর্তিটার কাঁধে, মাথায় শোভা পেতে লাগলো ওদের নোংরা কাপড়, গামছা, থলে ইত্যাদি। ওদের কেউ কেউ আবার মাস্টারদার পরম ভক্ত। তাঁর উদ্দেশ্যে গাঁজার কল্কে বা দোচুয়ানির গ্লাস উৎসর্গ না-করে তারা মুখেই তুলতো না।

এর অল্প ক’বছর আগে অবশ্য আরো একটা ভালো কাজ হয়ে গিয়েছিলো। আরেক দলের আরেক নির্বাচিত সাংসদ টাউট-বাটপারদের কবল থেকে সূর্যবাবুর ভিটেটা উদ্ধার করে সেখানে একটা সরকারি দাতব্য হাসপাতাল খুলে দিলেন। মহাসমারোহে সেটার উদ্‌বোধন হলো। সূর্য সেনের সহযোদ্ধা বয়োবৃদ্ধ বিপ্লবীরা আরো একবার অতিথি হিসেবে এসে বক্তৃতা-টক্তৃতা দিয়ে গেলেন। সেনগুষ্টির সর্বশেষ যেজন তখনো নিজ ভিটের মাটি কামড়ে পড়ে ছিলেন, দাতব্য হাসপাতালের উদ্‌বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁকেও একটেরে একটা আসন দেয়া হয়েছিলো, যদিও বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়নি।

সেই সাংসদ আরো একটা ভালো কাজ করলেন— সেনপাড়ার নাম পাল্টে তিনি ‘সূর্য সেন পল্লী’ করে দিলেন। তারই বদৌলতে আজ দূর-দূরান্তের একজন সাধারণ রিকশাওয়ালা পর্যন্ত বিপ্লবী সূর্য সেনের নাম জানে। চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের পথের হাট স্টপেজে নতুন কোনো যাত্রী নামলে সাগ্রহে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, “কোথায় যাবেন বাবু? সূর্য সেন পল্লীতে তো?”

কিন্তু এতসবের পরও সূর্য সেনের গুষ্টির শেষজন তাঁর ভিটেয় টিকতে পারলেন না। পুরোনো ইঁদুরগুলো ভেতরে ভেতরে ঠিকই মাটি খুঁড়ে যাচ্ছিলো।

সেনপাড়ার বাকি সবাই দেশ ছাড়লেও, সূর্যবাবুর জ্ঞাতি ভাইপো যতিন সেন কিন্তু ভিটে ছেড়ে না-যাওয়ার জন্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রোডলারে ফুলে-ফেঁপে ওঠা তাঁদের সাবেক বর্গাচাষী পরিবারের ছেলেরা তাঁকে ভিটেছাড়া করেই ছাড়লো।

এ-জন্যে তারা সুদূরপ্রসারী জাল পেতেছিলো। প্রথমে তারা যতিনবাবুর পিতৃহীন ভাইপোটাকে তাদের জালে ফাঁসালো। মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছেলেটার হাতে তারা তুলে দিলো ব্রাউন সুগারের পুরিয়া। তার পড়াশোনা সব অচিরেই চুলোয় গেলো। নেশার টাকার জন্যে সারাক্ষণ হন্যে হয়ে ঘুরতে লাগলো সে।

এর পর তারা ছেলেটার কানে মন্ত্র ঝাড়তে লাগলো যে, তার বাবা বেঁচে না-থাকায় তার ভাগের সব সম্পত্তি তার খুড়ো-জ্যাঠারা মেরে খাচ্ছে, এবং তাকে তার প্রাপ্য ভাগ দিচ্ছে না। তারা তাকে বোঝাতে লাগলো, বাড়িভিটে, জমিজমা সব বেচে দিলে তারা নগদ টাকা দিয়ে কিনে তো নেবেই, উপরন্তু সে যাতে তার ন্যায্য ভাগটা পায়, তার জন্যে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থাও নেবে।

হার্ড ড্রাগে আসক্ত একজন অর্বাচীন তরুণের জন্যে এর চেয়ে ভালো প্রস্তাব আর কী হতে পারে! অচিরেই সে বাড়িতে এমন কুরুক্ষেত্র বাধালো যে, যতিনবাবু শেষপর্যন্ত সব বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন। ভাইপোকে সুপথে ফেরানোর সাধ্য সেই বুড়োবয়সে তাঁর আর ছিলো না। কাজেই তার চাপের কাছেই তিনি নতি স্বীকার করলেন।

স্বাভাবিকভাবেই, প্রাক্তন বর্গাচাষীর উঠতি ধনী ছেলেরাই সব কিনে নিলো। সাপও মরলো, লাঠিও ভাংলো না।

তবে শর্ত রইলো যে, অশীতিপর যতিন সেন বাকি যে-কটা বছর বাঁচবেন, ততদিন তিনি ও তাঁর পরিবার ওই ভিটেতেই থেকে যাবেন। কিন্তু মাস-দু’মাস না-কাটতেই ওই বাড়িতে একদিন ডাকাত পড়লো। সেন বংশীয়দের বাড়িতে অতীতে কখনো যা ঘটেনি, এবার তাই ঘটলো। যতিনবাবু আগেই কথাবার্তা কমিয়ে দিয়েছিলেন, এ-ঘটনার পর একেবারে নির্বাক হয়ে গেলেন।

পরদিন সকাল না-হতেই যতিন সেনদের বাড়ির দরজায় দুটো অটোরিকশা এসে দাঁড়ালো, এবং ওগুলোতে চেপে সাতপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে তিনি ও তাঁর পরিবার যাত্রা করলেন অজানার উদ্দেশ্যে। যতিনবাবুর বিপথগামী ভাইপোটাকে সে-সময় ধারেকাছে দেখা গেলো না। সম্পত্তি বিক্রির টাকার ভাগ নিয়ে সে যে কোথায় গা ঢাকা দিয়েছে, তা কেউ বলতে পারলো না।

পরের কয়েকদিন চট্টগ্রাম শহরে এক আত্মীয়বাড়িতে থেকে, তারপর যতিনবাবুরা চলে গেলেন পাশের দেশে, যেখানে তাঁদের সম্প্রদায় সংখ্যাগুরু।

তাঁদের চলে যাওয়ার পর ব্যাপক গুজব শোনা গেলো যে, যতিন সেনদেরকে দ্রুত উচ্ছেদ করে তাঁদের বাড়িভিটের দ্রুত দখল নেয়ার উদ্দেশ্যে সেখানে ডাকাত লেলিয়ে দিয়েছিলো সেগুলোর নতুন মালিকরাই।

অতঃপর স্থানীয় মানচিত্রে ঠিকই থেকে গেলো সেনপাড়া বা সূর্য সেন পল্লী, কিন্তু সূর্য সেনের জ্ঞাতিগুষ্টির একজনেরও সেখানে ঠাঁই রইলো না।

যতিনবাবুর ভাইপো, একদার মেধাবী ছাত্রটি এখন এক আধবুড়ো আধপাগল। তার বর্তমান সঠিক ঠিকানা কারোরই জানা নেই। তবে শোনা যায় যে, কোনো-কোনোদিন সে রাতের আঁধারে গা ঢাকা দিয়ে তাদের ভিটেয় ফিরে আসে, আর গুমরে গুমরে কাঁদে।

এই অবাঞ্ছিত উপদ্রব থেকে রেহাই পাওয়ার বিস্তর চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর এবার নতুন মালিকরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ওই ভিটের পুরোনো মাটির ঘরগুলো ভেঙে ফেলে সেখানে টানা বেড়ার ঘর তুলে স্বল্প আয়ের লোকদের ভাড়া দেবে। তাতে এ-উপদ্রবের হাত থেকে রেহাই মিলবে, সেইসঙ্গে মাসান্তে পকেটে কিছু টাকাও আসবে।

বাড়িটা ভেঙে ফেললে লোপ পাবে সূর্যবংশীয়দের শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকুও। সূর্য সেন পল্লীতে আর সবাই, সবকিছুই আছে, থাকবে, শুধু নেই এবং থাকছে না তাঁর বংশের স্বজন-পরিজনরা ছাড়া।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: