নামকরণের যোগ্যতা হারিয়েছে বাংলা ভাষা?

বাংলা ভাষা কি দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে?

নাকি নামকরণের জন্য উপযুক্ত ও যথার্থ শব্দ এ-ভাষায় আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না? উপন্যাস, কবিতা, গল্পগ্রন্থের নামকরণ দেখছি ইংরেজিতে করা হচ্ছে। অকারণেই। কারণে হলে ক্ষতি নেই।

গত কয়েকবছরে অসংখ্য মঞ্চনাটক, টেলিভিশন নাটক, সিনেমার নামকরণ হয়েছে ইংরেজিতে। তার অনেকগুলো আমি নিজে দেখে ইংরেজি ভাষায় নামকরণের কারণ উদ্ধার করতে পারিনি। যেমন ধরুন (টিভিনাটক) : ইমারজেন্সি মেরিজ , লাভার সিদ্দিক, দ্য পেইন্টার, ব্লাইন্ডনেস, লাইফ ইজ কালারফুল, অ্যাভারেজ আসলাম ইজ নট অ্যা ব্যাচেলর, লাস্ট ডেট অব সুইসাইড, ওয়ান টু সিক্স, মেইড ফর ইচ আদার–ইত্যাদি ইত্যাদি। বছরখানেক আগে একটা মঞ্চনাটক দেখলাম জেলহত্যা নিয়ে। বাংলাদেশের ইতিহাস-নির্ভর এই গুরুগম্ভীর নাটকের নাম রাখা হয়েছে ‘সিক্রেট অব হিস্ট্রি’। কেন? বাংলায় রাখা যেত না!

পত্রিকাতে কাজ করার সময় ঢাকার প্রায় প্রতিটা গ্যালারির চিত্রকলা প্রদর্শনী দেখেছি। এখনও যাই। প্রায় নব্বইভাগ চিত্রকলা প্রদর্শনীর শিরোনাম হয় ইংরেজিতে। চিত্রকলার নাম যে ইংরেজিতে রাখা হয়, তার একটা যুক্তি থাকতে পারে যে, ছবির ক্রেতা বেশিরভাগ বিদেশি। কিন্তু প্রদর্শনীর শিরোনাম বাংলায় নয় কেন? হাসপাতাল, ব্যাংক, বেসরকারি/ব্যক্তিমালিকানাধীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম তো বাংলাতে হয়-ই না। দোকানপাটের নামকরণ বাংলায় করার চল উঠেই গেছে। খাবার-পোশাকের দোকানের নামকরণ নাকি ইংরেজিতে না করলে খ্যাত খ্যাত মনে হয়! ঝিগাতলা থেকে শংকরের পথে যাওয়ার সময় আমার রোজই মনে হয়, ইউরোপের দোকানপাট সব ঢাকায় শাখা খুলে দিয়েছে!!

শিল্প-সাহিত্যে কি একই রোগ বাসা বাঁধছে???

যে জাতি রক্ত দিয়ে নিজের মাতৃভাষার অধিকার অর্জন করেছে, সে জাতির নিজ-ভাষা ব্যবহারে এত হীনমন্যতা কেন? দরকারে ইংরেজি কেনো পৃথিবীর যে কোনো ভাষা ব্যবহার করা যাবে। আমাদের আগের পণ্ডিতরা বহুভাষী ছিলেন। অনেকেই অনেকগুলো ভাষা জানতেন। কিন্তু যখন বাংলা লিখতেন, তখন বাংলা-ই লিখতেন। এখনো আমরা ইংরেজির অধ্যাপক প্রাবন্ধিক-চিন্তক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে বিশুদ্ধ বাংলায় লিখতে ও বলতে শুনি। তিনি কি ইংরেজি কম জানেন। অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর মতো পণ্ডিত মানুষও তো ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে খিচুড়ি পাকাননি। বাংলা ভাষা যখন সাহিত্যের জন্য পরিণত হচ্ছে তখনই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, তিন বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, লিখেছেন আমাদের পূর্বজ খ্যাত-অখ্যাত সব লেখকই। তাঁদের শব্দ-সংকট হয়নি। আমাদের হচ্ছে? নাকি ইংরেজিটা আমরা তাঁদের চেয়ে বেশি জানি? কিংবা আমাদের পাঠক/দর্শক সেই সময়ের পাঠক/দর্শকদের চেয়ে ইংরেজি ভাষায় দক্ষ হয়ে উঠেছেন? মুখে মুখে অনেক সময় ভাষার বিকৃতি ঘটে। লেখক যেমন জনমানুষের মুখের ভাষা সাহিত্যে তুলে আনবেন তেমন, তিনি ভাষা নির্মাণও করবেন। সমাজের জন্য উপযুক্ত ভাষা নির্মাণ করাটাও লেখকের কাজের মধ্যে পড়ে। সাম্যতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ভাষার বিশৃঙ্খলা রোধ করার কাজটিও মানবিক আন্দোলন হিসেবে গণ্য হয়৷ যার পেটে খাবার নেই, যার পরনে পোশাক নেই এবং যার মুখে মাতৃভাষা নেই (মানভাষা না হতে পারে) তারা সকলেই অভাবগ্রস্ত।।

একটা ঘটনা বলে শেষ করছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার বিলেতে গেছেন। এক বাঙালি এসেছেন, দেখা করতে। বললেন, কবিগুরু আমি তো অনেকদিন বিলেতে আছি, বাংলাটা ঠিক মতো বলতে পারি না। আপনার সমস্যা না হলে ইংরেজিতে আলাপ করতে চাই। রবীন্দ্রনাথ বললেন, ঠিক আছে। এরপর আলাপ শেষ করে ঐ ভদ্রলোক যখন উঠে যাচ্ছেন, তখন রবীন্দ্রনাথ বললেন, আপনি এতদিন বিলেতে থেকে বাংলাটা ভুলে গেছেন, আবার ইংরেজিটাও ঠিক মতো শিখতে পারেননি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: