পলান সরকার : একজন ভালবাসার ফেরিওয়ালার গল্প – ১

মনে রাখবার মতোন নিরব সাধকদের খোঁজ নিতে গিয়ে বিস্মিত যেমন হই, তেমনি খুশিতেও মনটা ভরে ওঠে। এই যেমন যখন জানতে পারি, জয়নুল আবেদিন রিকশা চালিয়ে ময়মনসিংহে হাসপাতাল করেছেন, কার্তিক প্রামাণিক নরসুন্দর হিসেবে পেশাগত কাজের সাথে সাথে বৃক্ষরোপন করে চাপাইনবাবগঞ্জে সবুজায়ন ঘটিয়েছেন, আর হাঁটতে হাঁটতে মনের আনন্দে গ্রামের মানুষকে বই পড়িয়ে ছেড়েছেন নাটোরের আলোকিত মানুষ, সাদা মনের অসাধারণ একজন মানুষ পলান সরকার।

বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদের অশিক্ষার অন্ধকারে পলান সরকাররা হয়ে উঠেছেন উজ্জ্বল এক একটি প্রদীপের মতো। উল্লেখ্য, রাজশাহীতে বিনামূল্যে বই বিতরণ করে সকলের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টির জন্য তাঁকে ইউনিলিভার বাংলাদেশ ‘সাদা মনের মানুষ’ খেতাবে ভূষিত করে। ২০১১ সালে তিনি লাভ করেন একুশে পদক। পলান সরকারকে নিয়ে আরও একটি আনন্দের সংবাদ হচ্ছে ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম ডে’ উপলক্ষে সারা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার দৈনিকে তার ওপর প্রতিবেদন প্রকাশ। বলা যায় টিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’র প্রচারণার ফলে পলান সরকার পেলেন বিশ্ব স্বীকৃতি। একজন আলোর ফেরিওয়ালা পলান সরকার ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ২৫ ভাদ্র মোতাবেক ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ৯ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। জন্মদিনে মহান এই আলোকিত মানুষটিকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা, ফুলেল শুভেচ্ছা।

 

২.
গ্রামের লোকেরা সকালে ঘুম ভেঙে দেখতে পায়, তাদের আঙিনায় হাস্যোজ্জ্বল মুখে দাঁড়িয়ে আছেন পলান সরকার। তাঁর কাঁধে ঝোলা, ঝোলার ভেতরে বই। বয়সে প্রায় শতবর্ষী, কিন্তু ত্রিশ বছরের যুবকের মতো আজো যেন সমান সচল। কাঁধে ঝোলা নিয়ে প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হেঁটে গ্রাম-গ্রামান্তরে যান। নিজের টাকায় কেনা বই বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে পড়তে দেন। পড়া শেষ হলে দিয়ে আসেন নতুন কোনো বই। এভাবে একটানা প্রায় চল্লিশ বছর ধরে করছেন এই কাজ। রাজশাহী অঞ্চলের প্রায় ২০টি গ্রামজুড়ে তিনি গড়ে তুলেছেন বই পড়ার এক অভিনব আন্দোলন। পলান সরকার, মানসিকতায় বৃদ্ধ নন মোটেই; শরীরও মনের কথা মেনে চলে, তবে সব সময় নয় হয়তবা, তবুও কাঁধে একটি ঝোলা আর ঝোলাভর্তি বই, চোখে মোটা কাঁচের ঘোলাটে চশমা, গায়ে সাদামাটা পাঞ্জাবী। হাঁটছেন গাঁয়ের কোনো মেঠো রাস্তা ধরে। পাশের ধানক্ষেত থেকে কেউ বলে উঠলো “বইওয়ালা দুলাভাই, কই যান?”। মিষ্টি হেসে জবাব দিলেন দুলাভাই। গ্রামের সকলের কাছে তিনি বইওয়ালা দুলাভাই নামে পরিচিত।

৩.
২০০৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রচারিত ‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠানে আলোকিত মানুষ হিসেবে তুলে ধরা হয় বইপ্রেমী পলান সরকারকে। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা গ্রামের পলান সরকার তার গ্রামে শুরু করেন এই বই পড়ার আন্দোলন। বই পড়ার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য তিনি নিজের টাকায় কেনা বই বিলি করেন সবাইকে। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে নতুন পাঠকের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন তিনি। এই বৃদ্ধ বয়সেও মাইলের পর মাইল হেঁটে গিয়ে বাড়িতে বাড়িতে তার পাঠকদের কাছে গিয়ে পুরনো বই ফেরত নিয়ে নতুন বই দিয়ে আসেন। নিজের ডায়াবেটিস রোগের কারণে প্রতিদিন রুটিন করে হাঁটা তার অভ্যাস। তাই এক কাজে দুই কাজ করেন তিনি। অনেকেই হাটের দিন তাদের পড়া পুরনো বই নিয়ে আসেন এবং সেই বই ফেরত দিয়ে পলান সরকারের কাছ থেকে নতুন বই নিয়ে যান। গ্রামের সব বয়সী মানুষই রয়েছে তার পাঠক তালিকায়। শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, ধর্ম ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের বই তিনি বিভিন্ন শ্রেণি ও বয়সের মানুষকে বিলিয়ে বেড়ান।

৪.
জন্মের মাত্র কয়েক মাস পরই তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। অর্থনৈতিক কারণে তিনি ষষ্ঠ শ্রেণির বেশি লেখাপড়া করতে পারেননি। নিজে লেখাপড়া বেশিদূর করতে না পারলেও পরিবারের সবাইকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন, কারণ জ্ঞানদান করাটাকে তিনি মহৎ কাজ বলে মনে করেন। তার এই বইপড়া আন্দোলনে সহযোগিতা করার জন্য ইত্যাদির মাধ্যমে তাকে দুই সেলফ ভর্তি বই দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে তার পাঠক সংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে তেমনি তার বই পড়ার আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। ইত্যাদিতে প্রচারের পর তাকে নিয়ে পত্র-পত্রিকায় প্রচ্ছদ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে, নির্মিত হয়েছে বিজ্ঞাপন। পলান সরকার ইত্যাদির পরবর্তী অনুষ্ঠানে বলেন, ‘ইত্যাদি’র অনুষ্ঠান হওয়ার পরে এবং ‘ইত্যাদি’ থেকে বই দেওয়ার পরে পাঠক সংখ্যা অনেক বাইরা গেছে’। শুধু তাই নয় এরপর তাকে নিয়ে নির্মিত হয় বিজ্ঞাপন, রচিত হয় নাটক, অনুষ্ঠিত হয় পলান মেলা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: