আলবেয়ার কাম্যু ও বহিরাগতের বয়ান – ৩

“আমি অনুভব করলাম, দিনের যে এক সুশৃঙ্খল ভারসাম্য, আমি তাকে নষ্ট করে ফেলেছি। সমুদ্রতটের যে এক প্রশান্তি মাখা পরিবেশ তাও আর নেই। আমি আবারও গুলি করলাম , পরপর চারবার……।‘

ক্যামুকে বলা হয় মাস্টার অব অবসার্ড। ক্যামুর এবসার্ড থিওরি এতই তারিফ লাভ করে যে এক পর্যায়ে তিনি কথা-বার্তায় ‘দ্যাটস এবসার্ড’ শব্দটির ব্যবহার বন্ধ করে দেন। অবসার্ডের অনেক অর্থের মাঝে আছে অযৌক্তিক, অর্থ হীনতা ও কিম্ভূতকিমাকার। এটা এমন নয় যে অবসার্ডের মন্ত্র নিয়ে তিনি হাজির হয়েছেন। বরং মানুষের মনস্তত্ত্বের বিচারে এই অ্যাবসার্ড এর থিউরি বা ধারণা যাই বলি-সেটা তিনি ব্যবহার করেছেন। অযৌক্তিকতা (absurd-ism)’র মধ্যে absurd মানে যৌক্তিক অযৌক্তিতা বুঝায় না, এর অর্থ হল মানবিকভাবে অযৌক্তিক। দর্শনশাস্ত্রে উদ্ভট বা অযৌক্তিক বলতে মানব মনের সেই অন্তর্দ্বন্দ্বকে বুঝায়, যেখানে অভ্যন্তরীণ মূল্যবোধ বা জীবনের মানে খুঁজতে চায়, কিন্তু মানবিকভাবে যা অসম্ভব।

অস্তিত্ববাদের নেই কোন নির্ধারিত সংজ্ঞা। একেকজনের কাছে এর অর্থ একেক রকম। তবে প্রায় সর্বসম্মতিক্রমে অস্তিত্ববাদ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত- আস্তিক্যবাদী এবং নাস্তিক্যবাদী অস্তিত্ববাদ। সোরেন কিয়ের্কেগার্দ আস্তিক্যবাদী এবং ফ্রেডরিখ নীটশে, জ্যা পল সার্ত নাস্তিক্যবাদী অস্তিত্ববাদের পুরোধা হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত।

জনসাধারণের বোঝার সুবিধার জন্য অস্তিত্ববাদের কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ব্যাপারে একমত হন আধুনিক দার্শনিকরা। প্রথমত, অস্তিত্ববাদী দর্শনের একদম কেন্দ্রে থাকে ব্যক্তি অস্তিত্ব। অস্তিত্ববাদের গবেষণার বিষয় হচ্ছে ব্যক্তি অস্তিত্বের ভয়ভীতি, দুর্বলতা এবং অন্যান্য মানসিক অবস্থার পর্যালোচনা করা। দ্বিতীয়ত, অস্তিত্ববাদ মানবজাতিকে সার্বজনীনভাবে বিবেচনা করে না। অর্থাৎ, ঠিক-বেঠিক, সত্য-মিথ্যা, ভুল-ভ্রান্তির কোন সর্বজনগৃহীত সংজ্ঞা প্রদান না করে প্রতিটি মানুষের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যে কোন সিদ্ধান্তের যথার্থতা বিবেচনা করাকে অনুপ্রাণিত করে। তৃতীয়ত, অস্তিত্ববাদ মানুষের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়াকে অনুপ্রাণিত করে এবং চতুর্থত, অস্তিত্ববাদ বলে- যেকোনো স্বাধীন সিদ্ধান্তের দায়ভার নিতে হবে সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির, যিনি সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলেন।

আলবেয়ার কামু, তিনি সবসময়ই বলে এসেছেন, তিনি অস্তিত্ববাদী চিন্তাধারার পথিক নন। তিনি সাহিত্যে যে ধারাটির শক্তিশালী প্রবর্তন ঘটিয়েছেন তার নাম এ্যাবজার্ডিজম বা অদ্ভুত বাদ। এ্যাবজার্ডিজম- নাস্তিক্যবাদী অস্তিত্ববাদের একটি শ্রেণীবিশেষ। এই ধারার মতে মানুষ জন্মের পরপরই লক্ষ্য করে যে তার তথাকথিত স্বাধীন সত্ত্বা সমাজের বিবিধ টানাপোড়েনে বন্দী এবং জীবনের শেষ প্রান্তে অমোঘ পরিণতি হিসেবে অপেক্ষা করে আছে মৃত্যু। এটা উপলব্ধি করার পর সে তার স্বাধীন অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নিবিষ্ট হয়। এমতাবস্থায় যদি সে তার আলাদা ব্যক্তি অস্তিত্ব নিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সাধনায় ব্যর্থ হয়, তবে সে সত্তা পরিণত হয় এক এ্যাবজার্ড সত্তায়।

অযৌক্তিকতা বাদ ও অস্তিত্ববাদ (existentialism) অনেক কাছাকাছি ধারণা বহন করে। জীবনের অযৌক্তিকতাকে অস্তিত্বের সংগ্রাম দিয়ে মোকাবেলা করাই হল অস্তিত্ববাদ। সুখ-দুঃখ, আলো-আঁধার, জীবন-মৃত্যু ইত্যাদি ধারণা পাশাপাশি উপস্থাপন করে কমু অযৌক্তিকতাবাদের নতুন সংজ্ঞা উপস্থাপন করেন। সুখ অস্থায়ী এবং মানুষের জীবনের নিশ্চিত গন্তব্য মরণ। তাই এই বাস জগতে সাফল্য ব্যর্থতা সুখ দুঃখের মাধ্যমে জীবনের অবহিত অনুমান অযৌক্তিক এবং উদ্ভট!

বিশ শতকের শুরুতে দর্শন আর সাহিত্য এগিয়ে চলেছে হাতে হাত রেখে। যান্ত্রিক সভ্যতার কাছে ক্রমশ নতি স্বীকার করতে থাকা মানুষের গগনচুম্বী লোভের নির্লজ্জ বহিঃপ্রকাশে মাত্র বিশ বছরের ব্যবধানে সংঘটিত হয় দু’দুটো প্রলয়ঙ্করী বিশ্বযুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ৩ থেকে ১৫ মিলিয়ন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রাণ হারায় ৬০ মিলিয়নেরও অধিক সংখ্যক মানুষ, যা সেই মুহূর্তে গোটা পৃথিবীর জনসংখ্যার আড়াই শতাংশ!

এই সময়টাতে মানুষ খুব বেশি করে শঙ্কিত হয়ে পড়ে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে। যেখানে প্রতিদিনের জীবনযাপন আর আগের মত থাকছে না, প্রতি মুহূর্তেই মানুষ ভুগছে নিজের অথবা প্রিয়জনের মৃত্যুর আশঙ্কায়, আকাশ থেকে বৃষ্টির বদলে বোমাবর্ষণ হয়ে তছনছ করে দিচ্ছে শহর, ঘরবাড়ি তখন স্বাভাবিকভাবেই সমষ্টিগত জনগোষ্ঠী নিয়ে চিন্তা করার কোন অবকাশই থাকে না। কে বুর্জেয়া আর কে প্রলিতারিয়েত সে চিন্তা বাদ দিয়ে সবাই নিজ নিজ ব্যক্তিসত্তাকে লক্ষ্য করতে থাকে আণুবীক্ষণিক দৃষ্টিতে।
গণ মানুষের এই চিন্তাধারার প্রভাব পড়ে দার্শনিকদের কর্মপন্থায়। তাই তারা মানব সভ্যতার এই ক্রান্তিকালে- “পৃথিবীর জন্ম কেন এবং কোথা হতে?”, “মানুষ সৃষ্টির কারণ কি?”, অথবা “পরম সত্য কি এবং মানুষের পক্ষে পরম সত্যের সন্ধান পাওয়া সম্ভব কিনা?”- এইসব ধোঁয়াটে প্রশ্ন নিয়ে নাড়াচাড়া বাদ দিয়ে এমন সব প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে ন্যস্ত হয়, যা মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেমন- “আমি কে?” , “অস্তিত্ব কি?” এবং “ মানুষ নিজের পরিচয় স্বাধীনভাবে বেছে নিতে পারে কি?”- এই সমস্ত প্রশ্ন তখন প্রাধান্য পেতে থাকে। অতিশয় শঙ্কাকুল একটি মুহূর্তে অস্তিত্ববাদ এগিয়ে আসে এমন একটি দর্শন হিসেবে, যা মানুষকে সমষ্টিগতভাবে বিবেচনা না করে প্রতিটি মানুষের অস্তিত্বকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে, প্রত্যেক ব্যক্তিসত্তা যে বা যারা নিজ অস্তিত্বের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করছে তাকে এবং তাদের দেয় বীরের মর্যাদা।

মানুষ যে জগতে বাস করে তার অর্থ খোঁজার মধ্যে এক ধরনের নিরর্থক ব্যাপার আছে। সেই জগতের প্রকৃত রূপ ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। মানুষ কিভাবে জীবনের প্রতিকূল বাস্তবতার মোকাবিলা করে তা-ই আলোচনার বিষয়। কিন্তু বিষয়টা তত হতাশাজনক নয়।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: