হুমায়ূন আহমেদ নিয়ে এক ছটাক বলি

একদিন হঠাৎ প্রিয় মানুষটা আমাকে সাথে নিয়ে নীলখেত গেলেন , কতক্ষণ কয়েকটা দোকানের খোঁজ করে হুট করেই একটা দোকানের সামনে দাঁড়ালেন , দোকানের নাম “সুলতান বুক হাউজ”। দোকান থেকে ২ টা বই কিনে হাতে দিতে দিতে বললেন ” আমি চাই আমার সঙ্গিনীর বই পড়ার অভ্যাস থাকুক , বই পড়ার অভ্যাস গড়ার জন্য এই লেখকের বই তোমাকে খুব সাহায্য করবে “। বই পড়ার অভ্যাস ছিল না কিন্তু বিশেষ মানুষ এর কাছ থেকে বই পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলাম সেদিন এবং আমার বই পড়া অভ্যাসের সূচনা হয়েছিল ।

বই দু’টা ছিল “হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম” এবং “কৃষ্ণপক্ষ” , জানি লেখকের নাম আপনারা রীতিমত বুঝে গেছেন ।
গতকাল হুমায়ূন আহমেদ এর মৃত্যুবার্ষিকী ছিল , সকাল থেকে টিভি আর যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে মানুষ তাকে নিয়ে কথা বলছে লিখছে, আমি নিজেও ৪-৫ বার লিখার জন্য আগ বাড়িয়েছি কিন্তু না লিখেই বসে ছিলাম কারণ আমার বিশ্বাস হয় না এই মানুষ টা আমাদের মাঝে নেই ; আজও তার অসংখ্য বই পড়া হচ্ছে এবং সে জীবিত থাকাকালীন সময় যেমন জনপ্রিয় ছিলেন ঠিক তেমন জনপ্রিয় হয়ে আছেন আজও।
এখন তার সম্পর্কে লিখার জন্য বসলাম কারণ হুমায়ূন স্যার এর হিমু পাগলা একজন আমাকে বললেন ” হেই , গালিবা আপু হিমু লেখককে নিয়ে কিছু লিখুন এবং গুছিয়ে লিখবেন কিন্তু” । তাকে বলছি “ভাই আমি গুছিয়ে লিখতে পারি না , আর হুমায়ূন স্যার কে নিয়ে যা লিখব বলবো সবই পুরাতন কথা , আমার আগে আরও হাজার মানুষ তার সম্পর্কে বলেছেন , তবুও আপনার কথা রাখার জন্য লিখছি ” ।

আমি হুমায়ূন স্যার এর অন্ধভক্ত না , না আমি হিমু কে প্রেমিক হিসেবে কখনো চেয়েছি , না নিজেকে রূপা মনে করেছি । একজন বই পড়ুয়া হিসেবে আমি তার এবং তার লিখার ভক্ত আর ভক্ত হওয়ার কারণ ৩ টা হচ্ছে –

১। তিনি খুব সহজ – সাবলীল ভাষায় নিজের চিন্তা ভাবনার সাথে সাথে মানুষের মনের কথাগুলো বলেগেছেন

২। তিনি যে চরিত্র গুলো নিয়ে তার গল্প – উপন্যাস – নাটক রচনা করেছেন সেই চরিত্র গুলোর ভুমিকা বা কাজ বা কথা পাঠকের বুঝতে কোন বিড়ম্বনা হয় না আর সব গুলো চরিত্রই বাস্তবিক এবং গল্প – উপন্যাস – নাটকগুলোও বাস্তবিক

৩। মধ্যবিত্ত পরিবারে যে সুখ আছে , হাসি – আনন্দ , সৌন্দর্য আছে স্যার এর লিখায় তা অবলীলায় প্রকাশ করে গেছেন ।

তিনি যেদিন মৃত্যুবরণ করেন সেদিন টিভি তে সারাক্ষণ তার পরিবার আর লেখক সমাজের আহাজারি প্রচার করা হচ্ছিলো । সবাই বলাবলি করছিল ” বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী শ্রেষ্ঠ লেখক ,বাংলা সাহিত্যের একজন কিংবদন্তি কে আমরা হারিয়ে ফেলেছি” । স্যার খুব বৃষ্টি পছন্দ করতেন , আশ্চর্য জনক ভাবে ২০১২- ১৯- জুলাই খুব খুব বৃষ্টি হয়েছিল । কিন্তু কোথায় আমরা তাকে হারিয়ে ফেললাম ! তিনি তো সবার মনে চিরসবুজ বৃক্ষ হয়ে নিজের অস্তিত্ব প্রকাশ করছেন ।

দু’টা ভিন্ন প্রসঙ্গ আসছে , বলার ইচ্ছে না থাকলেও বলতে হচ্ছে ;

প্রসঙ্গ ১ঃ আজকাল দেখা যাচ্ছে স্যার এর লিখা কপি করে আংশিক পরিবর্তন করে বই প্রকাশ করছেন অনেকে , কেও এ বিষয়ের বিরুদ্ধে কথা বললে তারা বিভিন্ন যুক্তি দেখায় বা বলে ” সম্পূর্ণ বা হুবহু কপি করলে সেটা অপরাধ , আমি তো তার মতো করে লিখার চেষ্টা করছি আরকি ! , আবার সরাসরি এটাও বলে”তিনি তো বেঁচে নেই এসবে আর কি হবে !। তাদের উদ্দেশ্যে একজন পাঠক হিসেবে বলতে চাই “আপনার মাঝেও লিখার গুন আছে , আপনাকে কেন কাওকে অনুকরণ করতে হবে ! আপনি নতুন কিছু করুন , মানুষ অবশ্যই নতুনত্বকে গ্রহণ করবে , আপনারা যেমন একই জিনিস দু’বার চান না তেমন পাঠকরা আরেকটা হুমায়ূন বা কপি হুমায়ূন চায় না । তিনি বেঁচে নেই তো কি হয়েছে তার হাজারও ভক্ত তো বেঁচে আছে , আপনাদের কোন অধিকার নেই তাদের লজ্জিত করার , তাদের কথা চিন্তা করে কপি করে লিখা বাদ দিন দয়া করে “।

প্রসঙ্গ ২ঃ কিছু লোক বা একটা গুষ্টি আছে তাদের দেখা যায় হুমায়ূন আহমেদ ” স্যার এর জন্ম বা মৃত্যু বার্ষিকী আসলেই তার নিন্দা করা শুরু করেন আর নিন্দা করার কারণ স্যার এর দু’ই বিয়ে । আমরা বাঙ্গালীরা জন্মগত ভাবেই অভ্যাস ভাল কিছু গ্রহণ করতে চাই না , যত খারাপ কিছু আছে সব সব আমাদের চাই এবং মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা করতে খুব খুব বেশি আনন্দ বোধ করি , যাকে বলে পৈশাচিক আনন্দ । এখন অনেকে বলবে “তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন সে খুব সাধু ছিলেন !/ নিজের মেয়ের বান্ধুবিকে বিয়ে করেছেন তাকে আপনি কোন মুখে ভাল বলছেন !!/ আপনি বলছেন আপনি অন্ধভক্ত না কিন্তু লিখার পুরোটা জুড়ে তার প্রশংসা – এর মানে কি !!? ”

আমি স্যার কে সাধু বলছি না এবং রক্তে মাংসে গড়া কোন মানুষকেই আমি সাধু বলি না কারণ মানুষ মাত্রই ভুল । তিনি দুই বিয়ে করেছেন এবং তার নিজের মেয়ের বান্ধুবিকে করেছেন তাতে হয়েছে টা কি ! হয়তো তিনি পরিস্থিতির শিকার ছিলেন তাই করেছেন । হুম , আমি মানি তিনি একজন ভাল লেখক হিসেবে জনপ্রিয় তার আদর্শ সবাই মনে ধারণ করে সে কথা বিবেচনা করে এটা তার একটা খারাপ দিক কিন্তু এটা খারাপ দিক জানা স্বত্বেও আমরা কেন খারাপ কিছু গ্রহণ করব ! তার ভাল দিক টা গ্রহণ করলে ক্ষতি কি ? !

আমি তার অন্ধভক্ত না কিন্ত লিখার পুরোটা জুড়ে তার প্রশংসা করছি , কেন করব না ! একজন গত হওয়া মানুষকে নিয়ে খারাপ খারাপ কথা কেন বলবো !! আর তার তো কোন খারাপ গুণ ছিল না ; ভাল কথা বলতে বা শুনতে কার না ভাল লাগে বলুন !?
প্রসঙ্গে ফিরে আসি – আমি স্যার এর মোটে মাত্র কিছু বই পড়েছি । আমি নিজেও বিশ্বাস করি স্যার এর বই মানুষের বই পড়া অভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করে । আজও হাজার মানুষের আলসে আর অবশর সময় সুন্দর করে তুলে তার বই । আমি প্রথম যে বইয়ের প্রতিক্রিয়া লিখি সে বইটা ছিল “হিমুর নীল জোছনা ” ; প্রথম তার লিখা বই দিয়ে প্রতিক্রিয়া লিখার শুরু করার কারণ টা হচ্ছে গল্পটা বুঝেছিলাম এবং প্রতিক্রিয়া লিখার মতো কঠিন কাজটা এই বইয়ের ক্ষেত্রে সহজ হয়েছিল ।

আমার ছোট খালা হুমায়ূন স্যার এর পাগলা ভক্ত , আজও তিনি তার বই ছাড়া অন্য কোন লেখকের বই পড়েন না । আমি যখন স্কুলে পড়ি একদিন তার কাছে গল্প শুনতে চেয়ে ছিলাম তিনি আমাকে হুমায়ূন আহমেদ স্যার এর বাকের ভাই চরিত্র সম্পৃক্ত যে নাটক সম্প্রচার হয়েছিল এবং বাকের ভাইকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার ফলে শাহবাগে আন্দোলন এবং শোকসভা হয়েছিল সেসব ঘটনা বলতে লাগলেন , আমি মনে মনে বলছিলাম-” কি পাগলের প্রলাপ বকছে !আল্লাহ্‌ জানে কি বলছে , একটা বানানো চরিত্রের জন্য এতো কিছু মানুষ কেন করবে, সবাই কি পাগল হয়ে গেছিল নাকি !” । কিন্তু কয়দিন আগে “আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই ” বইটা পড়ে জানতে পারি আসলে সেসব ঘটনা সত্যি , এই মানুষটার লেখার ক্ষমতা ছিল মানুষকে কল্পনার জগতে নিয়ে যাওয়ার । আর তিনি মানুষ হিসেবেও চমৎকার মানুসিকতার অধিকারী ছিলেন ।

অনেক কিছু লিখে ফেললাম সমাপ্তি টানতে স্যার এর যে বই গুলো আমি পড়েছি সেসব বইয়ের আমার পছন্দের কিছু লাইন বা উক্তি উল্লেখ্য করতে চাচ্ছি –
“ভোরবেলা যে পাখি ডাকে তার নাম কাক । প্রকৃতি অসুন্দর কিছু সৃষ্টি করে না -কাকের মধ্যেও সুন্দর কিছু নিশ্চই আছে”।
-হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম ( পৃষ্ঠা -৪৩)

“বাংলা ভাষার লেখক হিসেবে আমি মহাভাগ্যবান । অন্যের ভাষায় আমাকে লিখতে হচ্ছে না , অন্যের হরফ নিয়েও আমাকে লিখতে হচ্ছে না । আমার আছে প্রিয় বর্ণমালা । এই বর্ণমালা রক্ত ও ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবীর বুকে গেঁথে দেয়া হয়েছে “।
– মে ফ্লাওয়ার ( পৃষ্ঠা – ২৭)

” কোন মহৎ আন্দোলনই ভুল-ভ্রান্তি ছাড়া হয় না । স্বর্ণের খাদের মতো ভুলগুলিও স্বর্ণেরই অংশ”।
-মাতাল হাওয়া ( পৃষ্ঠা – ২১৫)

” এখন তোর দু’পা
যেখানে ইচ্ছে সেখানে যা
যখন হবে চার পা
ভাত কাপড় দিয়ে যা ,
যখন হবে ছয় পা
বাবা! তুমি যাবা না “।
-রূপা ( পৃষ্ঠা – ৫৩)

“লাবসু সহজ গলায় বলল , মানুষ অদ্ভুত কথা বলতে পছন্দ করে । সাধারণ জীবন তার পছন্দ না , এর মধ্যেও সে রহস্য নিয়ে আস্তে চায় বলেই এইসব বলে ।

ইদরিস বললেন , রহস্য সে কেন আনতে চায় ?
লাবসু বলল , যে জিনিস নাই তার জন্য মানুষ থাকে ব্যাস্ত । রহস্য বলে কিছু নাই কিন্তু মানুষ রহস্য বিশ্বাস করে”।
– মধ্যাহ্ন-২( পৃষ্ঠা – ১০৫)

“যে অন্যকে ভয় দেখায় সে নিজে সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকে”
-হিমুর নীল জোছনা ( পৃষ্ঠা -৪৩)

” জ্যোতিষবিদ্যা কোন বিদ্যা নয় । জ্যোতিষবিদ্যা হচ্ছে এক ধরনের অপবিদ্যা , অপবিজ্ঞান। মানুষের ভবিষ্যৎ তার হাতের রেখায় থাকে না। থাকার কোন কারণ নেই ।
-আপনারে আমি খুঁজিয়া বেড়াই ( পৃষ্ঠা – ২১)

ওপারে ভালো থাকবেন স্যার । আমাদের ভালোবাসা নিবেন । আপনি চিরজীবন সবার মনে ছিলেন – আছেন – থাকবেন ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: