ট্রাম্প, ভাষা ও রাজনীতি

২০১৬’র সবচেয়ে বড় চমক, ডোনাল্ড জে ট্রাম্প সাহেব আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। অবাক হবার বিষয় এটাই, একজন কোটিপতি যখন নিজেকে শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ হিসেবে দাবী করেন, এবং তিনি হয়ে যান আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ নিম্ন আয়ের মানুষের কন্ঠ। বার্নি স্যান্ডার্স যেরকম ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মানুষের আওয়াজ। স্যান্ডার্সের বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিভূ হয়ে ওঠা টা তেমন অবাক কাউকে করেনি। সুচিন্তিত, সুপঠিত ভাষণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চা’র আসর ও জমিয়ে তুলেছিল, তার সাক্ষী আমি নিজে।

আমেরিকান সম্পদশালী অংশের সবচেয়ে উপরে বসে থাকা ট্রাম্প কীভাবে শ্রমিক শ্রেণীর প্রতিনিধি হিসেবে জনপ্রিয় হলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা বেশ জটিল। এর সাথে যদি আমরা ট্রাম্পের পলিসি এবং অর্থনৈতিক পরিচিতি ঘাঁটি, দেখতে পাবো বেশিরভাগই শ্রমিক বান্ধব নয়। তারপরেও, আজ ইলেকটোরাল কলেজ আর ৬৫ মিলিয়ন ভোটে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। লিডার অফ দ্য ফ্রি ওয়ার্ল্ড। অনেকে অনেক দিক থেকে দেখছেন। সাংবাদিক, একাডেমিক একেকজন একেকদিক থেকে দেখছেন। প্রশ্ন টা আমাদের সবাইকেই অবাক করেছে, কীভাবে একজন কোটিপতি তার অর্থনৈতিক চিন্তার সম্পূর্ণ উল্টো ঘরানার মানুষের কাছে তীব্র জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন?

ভাষাতাত্বিক জর্জ লাকফ (২০১৬) মনে করেন, রক্ষণশীলদের মাঝে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার কারণ তাঁর বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। ট্রাম্প এমন এক নৈতিক জগত তৈরি করার কথা বলেন যেখানে শাস্তির ধারণা কে প্রচন্ড গুরুত্ব দেওয়া হবে। যেকোন ব্যাক্তিকে দ্রুত শাস্তি দেওয়াই হচ্ছে ট্রাম্পের পুরো ক্যাম্পেইন এর সার কথা। অপরাধ যেমন ই হোক, শক্ত হাতে দমন করা হবে। বিষয় টা লে মিজারেবল এর জাঁ ভালজাঁর কথা মনে করিয়ে দেয়। ক্ষিধের জ্বালায় আর বাড়ির শিশুদের মুখ চেয়ে চুরি করা রুটি, ভালজাঁ কে দেয় নির্বাসন। এহেন শাস্তির ধারণা, রক্ষণশীল পুরুষতন্ত্রের সাথে খুব মেলে।

নৃবিজ্ঞানী তানিয়া লুহরমান (২০১৬) বিভিন্ন ধর্মীয় এথনোগ্রাফির সাথে ট্রাম্পের ক্যাম্পেইন কে তুলনা করেন। ট্রাম্প একটি নতুন বয়ান নিয়ে এসেছেন। এই বয়ানে যতটা না রাজনৈতিক ক্রোধ কাজ করেছে, তার থেকেও বেশি কাজ করেছে এক ধরনের ধর্ম চেতনা। একটা নতুন গল্প, কিছু নতুন সামাজিক চুক্তি, নতুন সম্ভাবনা। সমাজবিজ্ঞানী আরলি রাসেল হশ্চাইল্ড (২০১৬) এই ঘটনাকে রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে তুলনা করেন। তিনি মনে করেন, আমেরিকান টি পার্টি সাপোর্টার রা যেমন ভাবেন একটি বদ্ধ অর্থনৈতিক ব্যাবস্থায়, ট্যাক্স, সর্বনিম্ন মজুরি ইত্যাদি সবকিছু অন্যায্য।

অন্যদিকে, জে ডি ভান্স (২০১৬) ট্রাম্পের এই জনপ্রিয়তা কে ব্যাখ্যা করেন বন্দুকের মালিকানা নিয়ে। লিবারেল এবং ডেমোক্রাট রা যখন বন্দুকের মালিকানা কে আরো জটিল করে তুলতে চাইছেন, ট্রাম্প তখন বন্দুকের জয়গান গেয়ে চলেছেন। এটাকে নিছক বন্দুকের মালিকানা ভাবলে আমরা ভুল করবো। বন্দুকের মালিকানা, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে একমাত্র রাজনৈতিক মতামত। শুধু গ্রামীণ নয়, যেসব আমেরিকান রাজনৈতিক কর্মকান্ড থেকে দূরে, তাদের সকলের জন্যে বন্দুকই একমাত্র রাজনৈতিক হাতিয়ার।

এটি ধারণা করা ভুল হবে, ট্রাম্প শুধুই শ্বেতাঙ্গ, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রতিভূ। গণমাধ্যম আর অন্যান্য জরিপ আমাদের কে সম্পূর্ণ আলাদা চিত্র দেখায়। সবকিছুর শেষে, ট্রাম্প এখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। তিনি জিতেছেন। আমেরিকার মত বহু সংস্কৃতির দেশে তাঁর জয় শুধু টাকার খেলা দিয়ে বোঝানো যাবেনা। ট্রাম্পের রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতা আমরা টিভির পর্দায় বেশ উপভোগ করেছি। ডেমোক্রাট থেকে শুরু করে ঢাকাই কম্যুনিস্ট; সবাই ট্রাম্প পরিচালিত এই নাটক গোগ্রাসে গিলেছি। টিভিতে ট্রাম্প, পত্রিকায় ট্রাম্প, কমেডি অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক প্রতিবেদন সব জায়গায় ট্রাম্প। ২০১৬ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের চেহারায় সয়লাব। এই ব্যাক্তির সরস উপস্থিতি, আর রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতার ফলে তৈরী হওয়া অদ্ভুত ঘটনাগুলো আমাদেরকে বিনোদন দিয়েছে।

এই সরস বিনোদনই কিন্তু ট্রাম্পকে আমাদের কাছে গ্রহণীয় করে তুলেছে। এমন এক সংস্কৃতিতে বাস করছি আমরা, যেখানে বিনোদন মাধ্যম আর সেলিব্রিটিরা হয়ে গেছেন আমাদের আকর্ষণের কেন্দ্রে। নব্য মার্ক্সবাদী তাত্বিকেরা মনে করেন, পুঁজিবাদ-চকচক করলেই সোনা হয়- এই মতবাদে বিশ্বাস করে। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী থেকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট; ট্রাম্পের এরাম উত্তরণ এর ভালো উদাহারণ হতে পারে।

 

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্পের ভূমিকা একজন বিদূষকের থেকে বেশি কিছু ছিল না। তিনি স্বেচ্ছায়, অনিচ্ছায় লোক হাসিয়েছেন। তবে ইতিহাসবিদ পিটার বার্কের (১৯৭৮) চোখে, ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দি পর্যন্ত সমাজে ভাঁড়দের একধরনের প্রভাব লক্ষ্য করেছেন। ভাঁড়ের আবেদন সমাজের সকল শ্রেণীতেই দেখা যেত। দার্শনিক মিখায়েল বাখতিন (১৯৮৪) ও সমাজের সকল শ্রেণীর মাঝে বিদূষকের প্রভাব দেখেছেন। এরা সবাইকেই বিনোদন দিতে পারে। শ্লেষ, রসাত্মক বয়ান, এসব দিয়ে সহজেই সমাজের যে কাঠামো, তাকে ভালোরকম ধাক্কা দেয়া সম্ভব।

ট্রাম্পের পুরো প্রচারণা আমাদেরকে সেটাই মনে করিয়ে দেয়। কৌতুক, রসিকতা, শ্লেষ এসবকে নিয়ে আমরা বেশি মাথা ঘামাই না। আমরা ওগুলো নিয়ে হাসতে ব্যাস্ত থাকি। কৌতুক নিয়ে আমরা গভীরভাবে ভাবি না। হাস্যরসের এক বস্তুকে নিয়ে আকাশ পাতাল ভেবে ফেলাটাও বুদ্ধিমানের কাজ নয় বলে ভাবা হয়। কিন্তু কৌতুকের জনমত তৈরী করবার যে ক্ষমতা, সামাজিক শ্রেণীবিভাগের দেয়াল ভেদ করে ঢুকে যাবার ক্ষমতা নিয়ে আমাদের হুঁশ আসলেও থাকে না।

 

ভাষাতাত্বিক নৃবিজ্ঞানের পথে হাঁটলে, আমরা ট্রাম্পের প্রচারণার একটা ধাঁচ খুঁজে পাবো। সম্পূর্ণ ঘটনার মধ্যে, ভদ্রলোক একটা বিনোদনের মাত্রা জুড়ে দিয়েছেন। তিনি অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করেছেন। নিজেকে আর তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করেছেন আমাদের সামনে। এই অঙ্গভঙ্গি, হাস্যকর উপস্থাপন, এসব ভাষা-সাংস্কৃতিক তুকতাক ব্যাবহার করে, ট্রাম্প অন্য প্রার্থীদের করেছেন খেলো, আর ঐ কৌতুকোচ্ছল পরিবেশে নিজেকে সবার কাছে ভাঁড় হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাতেই কাজ হয়ে গেছে। সবাই ট্রাম্পে বুঁদ। ফলাফল, ট্রাম্পের আমেরিকা।

প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীরা সব সময়ই বেশ গম্ভীর। পলিসি নিয়ে আলোচনা, অর্থনীতি কপচানো, এসবই চলেছে সবসময়। ট্রাম্প সে জীবনবব্যাবস্থা ভেঙ্গে ফেললেন। এতে যোগ করলেন বিনোদন। পুরো রাজনৈতিক হ্যাবিটাসে ওলট পালট। পুরনো হ্যাবিটাসের ক্ষমতা কাঠামোর চক্রে পড়ে হাঁফাতে থাকা অনেক ভোটার পেলেন দম ফেলার জায়গা। যিনি রাজনীতি, তত্বকাঠামো থেকে বহু দূরে থাকতেন, ট্রাম্পের রঙ্গ তার দুর্দান্ত লেগে গেল। আর বিনোদনের রাজ্যে ট্রাম্পের বিচরণ অনেকদিনের। রাজনীতি তেমন না খেললেও, বিনোদিত করতে তিনি সিদ্ধহস্ত।

 

বিনোদনকে ট্রাম্প ব্যাবহার করেন ঢাল হিসেবে। তাঁর বক্তব্যের সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, ‘সবই বলেছি মজা করার জন্য’ (২০১৫, বিবিসি)। পরে, নিজের রিয়ালিটি-টিভি অনুষ্ঠান দ্য এপ্রেন্টিসের দোহাই পাড়েন তিনি। দ্য এপ্রেন্টিসে, কর্পোরেট দুনিয়ার এক ঝাঁজালো বসের ভূমিকা নিয়েছিলেন ট্রাম্প। তাঁর দাবী, লোকে ঐ ভূমিকা ভালোবসেছিল, তাই সেই একই ভূমিকা তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিয়েছেন।

রিয়ালিটি টিভি শুনতে রিয়েল বা আসল শোনালেও, বিষয়টা সেরকম আদৌ নয়। এর মধ্যে জাদুর আঁচ পাওয়া যায়। বিষয়টা ম্যাজিক। রিয়ালিটি টিভি আদতে বাস্তবের একটা নাটকীয় প্যারোডি, যেটা কালচার ইন্ডাস্ট্রি আমাদের জন্য বানিয়েছে (আন্দ্রেয়াভিচ ২০০৪)। কারণ, টিভি আর রিয়ালিটি এই দুই এর মাঝে বাস্তব আর অবাস্তবের একটা মিশেল আছে (বার্থ ১৯৫৭)। সবার জন্যেই আছে খোরাক। যে বিশ্বাসী সে ভাবছে ‘আহা! এও হয়?!’ আর তার্কিক ভাবছে, ‘দুচ্ছাই! ছাই পাঁশ গেলাচ্ছে।’ তবুও, বিনোদন উপভোগ করছে দু’পক্ষই।

 

ট্রাম্পের এন্টারটেইনার পরিচয়, তাঁকে এক সাংস্কৃতিক বর্ম দিয়েছে। তাঁকে মিডিয়ার অগ্নি তুফান থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কারণ, তিনি সবাই তাকে ভাঁড় হিসেবেই মেনে নিয়েছে। আমেরিকার সংস্কৃতিতে তিনি রাজনীতিক নন। বরঞ্চ একজন বিদূষক হিসেবেই স্বীকৃত। তাঁর অভব্যতা বিনোদন। কিন্তু মার্কো রুবিও যখন ট্রাম্পের হাতের আকার নিয়ে চটুল রসিকতা করেন, হাঁটতে যান ট্রাম্পেরই পথে; সেটা একেবারে বুমেরাং হয়ে যায়। রুবিও কে ক্ষমা চাইতে হয় সবার কাছে। কারণ, আমেরিকার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তিনি রাজনীতিক, ভাঁড় নন। তিনি না বলেও বলে দেন অনেক কিছু।

 

ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণার ভাষণ দেখলে স্ট্যান্ড আপ কমেডির কথা মনে পড়ে সবার আগে। তার কথা বলার ঢং, অঙ্গভঙ্গি, আচরণ সবই ওরকম। এমনকী পেশাদার কমেডিয়ান যেমন সামান্থা বি, ট্রেভর নোয়া, জন অলিভার সবাই বলেছেন ট্রাম্পের এহেন কর্মকান্ড আদতে একটি কমেডি রুটিন ছাড়া আর কিছু নয় (দেখুন The Daily Show 2016)। এহেন প্রেসিডেন্ট ক্যান্ডিডেট আগে দেখেনি কেউ। তবে লোকে টেনে নিচ্ছে। স্যান্ডার্সের সুপঠিত তর্কও দিনের শেষে পুরনো রাজনৈতিক বয়ানের অংশ। ওতে বিনোদন নেই। ট্রাম্পে আছে। ট্রাম্পে টিআরপি বাড়ে। টেলিভিশন থেকে শুরু করে সবাই ছুটছে ট্রাম্পের পেছনে। ভোগবাদী সংস্কৃতির খেল তখন থেকেই শুরু।

ট্রাম্প শুরু থেকেই একটি পণ্য। ট্রাম্প টাওয়ার, ট্রাম্প স্টেইক, ট্রাম্প টাই, ট্রাম্প ভডকা, তিনি একেবারে জীবন্ত পণ্য। এই পণ্য যখন রাজনীতিতে ঢুকে গেল, পালটে গেল বয়ান। রাজনীতিকেও ভোগ করা যায়, বিনোদন দেয়া যায় সেটা আমাদের সামনে নিয়ে আসলো আমেরিকান কালচার ইন্ডাস্ট্রি। আমরাও সে ভোগে ব্যাস্ত হয়ে গেলাম। কারণ, সংস্কৃতির বাজারে, বিনোদন ভালো পণ্য। সবার জন্য পণ্য। বিনোদন ফকির থেকে আমির সবারই দরকার। ট্রাম্পের রাজনৈতিক পণ্যের দাম, ৩০৬ ইলেকটোরাল কলেজের ভোট।


Bibliography

  • Andrejevic, Mark. 2004. Reality TV: The work of being watched. Boulder, CO: Rowman and Littlefield.
  • Bakhtin, Mikhail. 1984. Rabelais and his world. Translated by Helene Iswolsky. Bloomington:Indiana University Press.
  • Barthes, Roland. (1957) 2009. Mythologies. Translated by Annette Lavers. London: Vintage Classics.
  • Blok, Anton. 2001. Honour and violence. Cambridge: Polity Press.
  • Burke, Peter. 1978. Popular culture in Early Modern Europe. New York: Harper and Rowe.
  • Hochschild, Arlie Russell. 2016. Strangers in their own land: Anger and mourning on the American right. New York: The New Press.
  • Lakoff, George. 2016. “Understanding Trump.” George Lakoff (blog). https://georgelakoff.com/2016/07/23/understanding-trump-2/.
  • Lakoff, Robin Tolmach. 1992. Talking power: The politics of language. New York: Basic Books.
  • Luhrmann, Tanya. 2016. “The paradox of Donald Trump’s appeal.” Sapiens. http://www.sapiens.org/culture/mary-douglas-donald-trump/.
  • Vance, J. D. 2016. Hillbilly elegy. New York: Harper Collins.

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: