ব্রেনে ব্রাউন কি প্রাসঙ্গিক? – ২

নিঃসঙ্গতাবোধ যে মানবিক সংযোগ হারিয়ে ফেলার শারীরিক সিগন্যাল সে তো দেখা গেল। কিন্তু প্রশ্ন হল,‘এখানে পৌঁছলাম কী করে আমরা?’ এর উত্তরে বুঝতে হবে কোন নিয়ামক আমাদের নিজেদের আলাদা আলাদা দলে ভাগ করে দেখতে শেখায়। কোন নিয়ামক আমাদের অন্য মানুষের সঙ্গে সংযোগ ছেঁটে ফেলে? ব্রেনে ব্রাউন উপাত্ত ঘেঁটে দেখলেন, সেই নিয়ামক ভয়।  অরক্ষিত অবস্থায় ধরা পড়ে যাবার, ব্যথা পাবার ভয়, সংযোগ হারিয়ে ফেলার ভয়। সমালোচনার ভয়, ব্যর্থতার ভয়। সংঘর্ষের ভয়। যথেষ্ট ভালো না হবার, সমাজ, পরিবার, পরিবেশ যা চায়, তার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারার ভয়, পিছিয়ে পড়ার ভয়, বাদ পড়ে যাবার ভয়।

৯/১১-এর আগে যে গবেষণা শুরু করেন ব্রেনে, সেই ঘটনা কীভাবে ভয়কে আগুনের মতো অনিবার করে তুলেছিল, তা দেখা তাঁর পক্ষে সহজ হল। তার পর থেকে সে দেশের জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছিল যে প্রশ্ন, তা হল,‘কাকে ভয় করব?’ আর ‘কার ওপর দোষ চাপাব?’

সন্ত্রাসের উপর সরাসরি কাজ না করেও ব্রেনে ‘ভয়’ নিয়ে পনেরো বছর ধরে কাজ করেছেন বলে জানতেন, সন্ত্রাস হল সময়-মাফিক বোতল থেকে ছাড়া পাওয়া জিনির মতো ভয়। শেষ পর্যন্ত বিশ্বের আর দেশের অভ্যন্তরে সন্ত্রাস এমনভাবে আঘাত হানে, যেন ভয় হৃদয়ের মাটির খুব নীচে চাপা পড়ে থাকে, মিশে একাকার হয়ে থাকে। যাতে জীবনযাপন হয় ভয়ের অপর নাম।

অথচ না জেনে না বুঝে এই ভয়ের মধ্যে বাঁচতে বাঁচতে মানুষ একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, অভিযোগ হানে। যে সংস্কৃতিতে ভয় শেকড় গেড়েছে সেখানেই সন্ত্রাসের ফলন ভালো হয়।

ব্রেনে দেখলেন ৯/১১-এর পরেই সে-দেশে উত্তরোত্তর নিঃসঙ্গতা আর বিভেদের বোধগুলো বেড়েছে।

অল্প সময়ের জন্য অবশ্য কোনো সন্ত্রাসের ঘটনার পরপর মানুষ পরস্পরের কাছাকাছি আসে। মানুষের মগজ সেভাবেই কাজ করতে থাকে। সেই প্রাথমিক সময়ে আমরা যদি আমাদের সম্মিলিত ভয়, শোক, বেদনা নিয়ে কথা বলি, একে অপরের ছায়ায় নিজেকে আনি, সহৃদয়তার সঙ্গে মিলি, ন্যায় আর জবাবদিহিতা খুঁজি, তাহলে হয়তো একটি দীর্ঘ উপশম বা নিরাময়ের প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

কিন্তু আমাদের যা মিলিত করে,তা যদি চেপে-রাখা, ভয়-পাওয়া ঘৃণা হয়, তাহলে সেই চেপে-রাখা ভয় অভিযোগ ছাড়া আর কিছু সৃষ্টি করতে পারবে না। সেটা হবে আমাদের কাল। সেটা হবে দারুণ সংকট।

আমরা কি ফিরে আসতে পারি, নিজেদের আর পরস্পরের কাছে? না এবং হ্যাঁ। নিজের কাছে বা পরস্পরের কাছে ফিরে আসতে সকলেই পারবে না, যেহেতু অনেকে মনে করে নিজেদের দাবি নিয়ে লড়াই করার মানে হল অন্য কোনো দলের মনুষ্যত্ব অস্বীকার করা। তাহলে দলের বাইরে কোথাও আমাদের মিলিত হবার সম্ভাবনা থাকে না। ব্রেনে বলেন, আমাদের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষ পারি বিভেদরেখা পার হয়ে সংযোগের পথ খুঁজে পেতে, নিজের লড়াইটা বাদ দিয়ে নয়। কিন্তু তার মানে হল, আমাদের অন্যদের কথা মন দিয়ে শোনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। এবং নিজেকে বর্ম দিয়ে ঢেকে রেখে নয়। সান্ত্বনার কথা হল,একটা নির্দিষ্ট ক্রিটিকাল জনসংখ্যা আছে,যে জনসংখ্যায় আমাদের পৌঁছতে হবে। এই জনসংখ্যা যদি বিশ্বাস করে ভালোবাসা আর সংযোগ দিয়ে পারস্পরিক বিভেদ দূর করা যায়,তাহলেই হল। কিন্তু সে চেষ্টা আমরা যদি না করি, তবে আমরা যা বিশ্বাস করি, যেসব কারণে আমরা লড়াই করি, তাদের মূল্য ধুলোয় মিশে যাবে।

তাহলে সত্যিকারের সংযোগ ঘটাতে গেলে আমাদের নিজেদের কাছে নিজেদের অনেক খাঁটি, অকৃত্রিম হতে হবে। ব্রেনে উপাত্ত ঘেঁটে দেখছেন, আমরা দলে দলে ভাগ হয়ে গিয়েও, দলের ওমে উত্তাপ নিয়েও কেন নিঃসঙ্গ রয়ে যাই, এবং কেন দলাদলি থেকে বের না হলে আমাদের সে অভাব পূরণ হয় না।

দলের ওমের ভিতরে আরামে শুয়ে থাকলে কোনো চিন্তা থাকার কিন্তু কথা না, এমনটা আমরা ভাবতে পারি। দলের মুখপাত্র যা বলবেন, তার সঙ্গে গলা মেলাতে হবে মাত্র। কাজটা সহজ মনে হয়, তাই না? কিন্তু সমস্যা হল, এই সমাধান তো কাজ করছে না। আদর্শগত ভেদাভেদ দলাদলি আমাদের কিছুতেই নিঃসঙ্গতাবোধ আর বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে রক্ষা করতে পারে না। তার মানে সব চেয়ে বুকভাঙা বিষয় থেকে আমাদের কিছুতে রক্ষা নেই, দলাদলি ছাড়িয়ে সংযোগ খোঁজা ছাড়া।

আমরা যদি পরস্পরের কাছে ফিরে না আসি, তাহলে ভয়, আতঙ্ক জিতে যায়। ব্রেনের কাজ নিয়ে যাঁরা জানেন,  তাঁরা জানেন, এ পথ সহজ নয়, আরামের নয় সবসময়। সাহসকে বেছে নেওয়ার পথ এটা। অরক্ষিত হয়ে দাঁড়াবার পথ, আঘাত পাওয়ার ভয় নিয়েও দাঁড়াতে হয়। গহন অরণ্যের (wilderness) ভিতর দিয়ে কী করে যেতে হয়, অথবা নিজেই কীভাবে সেই গহন অরণ্যে রূপান্তরিত হতে  হয়, সে কথাই জানা যায় এর পরে।

অসম্ভব নিঃসঙ্গতাবোধ যেমন বেদনাদায়ক, শুরু করার পক্ষে তেমন এক অদ্ভুত সুন্দর জায়গাও বটে, জানান ব্রেনে। আমরা যদি ব্যথা-বেদনাকে বিশ্লিষ্ট করে চারিদিকে ছড়িয়ে না দিয়ে বরং ধারণ এবং বরণ করে নিই, গভীরভাবে অনুভব করি, তাহলে আমাদের মধ্যে সেই পরিবর্তন হয়, সেই রূপান্তর ঘটে, যে পরিবর্তন সমাজে নিরাময় আনে। ব্রেনের কথায়, “আমি এমন এক পৃথিবীতে বিশ্বাস করি, যেখানে আমরা শিল্প আর শব্দ ভাগাভাগি করে নিতে পারি – যেখান থেকে আমরা পরস্পরের কাছে ফিরে আসতে পারি। তাহলেই সংগ্রামের সময়, লড়াইয়ের সময়, আমরা দূর থেকে পরস্পরকে আঘাত না হেনে, সাহায্য করতে পারব, পরস্পরের জন্য দাঁড়াতে পারব।”


জেমস বল্ডুইনের ধারণায়, মানুষের ভিতর এতটা ঘৃণা থাকার কারণ হল, এই ঘৃণা (hate) যেদিন মুছে যাবে, সেদিন মানুষকে তার ভেতরকার বেদনার সঙ্গে যুঝতে হবে।

মানুষ বেদনা চায় না, তাই আশ্রয় করে ঘৃণাকে। এটাই আমরা বুঝতে পারি এ কথা থেকে।

বল্ডুইনের ওই কথাগুলি তুলে ধরে শুরু হয় ব্রেনের আরেক অধ্যায়,‘কাছ থেকে মানুষকে ঘৃণা করা কঠিন। চলো, কাছে যাই।’

ব্রেনে বলতে থাকেন, আমরা যদি পৃথিবীর একটা ওয়াইড অ্যাঙ্গেল শট নিয়ে  ‘জুম আউট’ করে তাবৎ দুনিয়াটা দেখি,তাহলে দেখব ২৪ ঘণ্টাব্যাপী দুনিয়াজোড়া খবর এক ধরনের ছবি তৈরি করেছে। সেখানে রাজনীতি, সামাজিক গণমাধ্যমের ভেতরে ঘৃণা উপছে পড়ছে। আমরা দেখি রাজনীতিকরা এমন আইন তৈরি করছেন যে আইনে দুনিয়ার সুস্থভাবে টিকে থাকা সম্ভব না। তাঁরা এমন কাজ করছেন যে আমাদের চাকরি চলে যায়। আমাদের পরিবার শেকড়ছাড়া হয়। আমাদের মর্যাদা মাটিতে লুটায়।

সামাজিক গণমাধ্যমে দেখি এমন সমস্ত মতামত, যা সত্য থেকে, জবাবদিহিতা থেকে এবং সব চেয়ে বড়ো কথা, নিজেদের আত্মপরিচয় থেকে ধড়হীন, বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

কিন্তু আমরা আমাদের জীবনে যখন ‘জুম ইন’ করি, কাছিয়ে যাই, তখন আমাদের রোজকার জীবনের ধুকপুক টের পেতে থাকি। টের পাই ভালবাসাকে, বিষাদকে। চিনি আশা, সংগ্রাম, সৌন্দর্য;  চিনি বিপর্যয় ছাপিয়ে বেঁচে থাকা। আমাদের সকলের মুখে রুপোর চামচ নেই, নামহীনতার আড়ালে লুকিয়ে থাকার বিলাস, অবকাশ নেই। আমরা শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিতে দিতে, একসঙ্গে ইস্কুলে নিয়ে যেতে যেতে, চাকরি করতে করতে, মমতাময় কোনো জীবন গড়ি, আনন্দকে বারবার উসকে দিতে চাই।

বৃহত্তর দুনিয়া যখন উচিত-অনুচিত বোধ থেকে মুখ সরিয়ে নেয়, সৃষ্টিশীল আলোচনা থেকে সরে আসে, ব্রেনে লক্ষ করেন, যেসব নারী আর পুরুষ বেশি ‘জুম ইন’ করে কাছের ছোটোখাটো দুনিয়ায় নিবিষ্ট থাকতে পারেন, তাঁদের মধ্যে চেনা-মাটি চেনা-সুখ এসবের সঙ্গে সংলগ্ন থাকার বোধ সব চেয়ে বেশি কাজ করে। তাঁরা দুনিয়ার তাবৎ ঘটনাপ্রবাহকে অস্বীকার করেন তা কিন্তু নয়। তাঁরা যা বিশ্বাস করেন, তা প্রচার করেন না, তাও নয়। তবে তাঁরা গভীরভাবে নিজেদের খাঁটি, প্রকৃত অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে তবেই অন্য মানুষ সম্পর্কে মতামত তৈরি করেন। আমরা বেশির ভাগ মানুষ যে-ফাঁদে পড়েছি সে-ফাঁদে তাঁরা ধরা দেন না – ফাঁদটা হল: আমি একটা বড়ো দলের অপরিচিত সমস্ত মানুষকে অনায়াসে ঘৃণা করতে পারি, কারণ সে দলের ভিতরে যাদের আমি চিনি, তারা আসলে ব্যতিক্রম। বাকিরা সব ঘৃণার যোগ্য।

ব্রেনে ভাবেন, দুনিয়াটাকে যদি একটা ওয়ার্ড ডকুমেন্টে ভরে তারপর যত রকম ‘ঘৃণা’-কে  ‘ফাইন্ড অ্যান্ড রিপ্লেস’ করা যেত ‘বেদনা’ শব্দটা দিয়ে, তাহলে কেমন হত ব্যাপারটা? তাহলে আমাদের আলোচনাগুলো কেমন দাঁড়াত? কাজ করত কি এই দুনিয়াটা ঠিকঠাক? যেমন কাজ করা উচিত?

মাঝে মাঝে ঘৃণা এত জোরালো হয়, এত মগজ ভরে থাকে, যে ব্যথা-বেদনা নিয়ে ইচ্ছে করে না ভাবতে। কিন্তু তাতে কি কাজ হবে? আমাদের আর অন্যদের গহন বেদনা না জানলে, না বুঝলে, কোনো সুবিধে হবে না – এটাই উপাত্ত দেখাচ্ছে। দুনিয়ায় কোনো সমাধান আসবে না। একটা বেদনার নদীতে আমরা ডুবে ডুবে মরে যাব – কতকাল ধরে? কতকাল পরে আমরা দেখতে চাইব এই ব্যথার উৎস কোথায়?

বেদনা নিভতে চায় না। জেগেই থাকে। আমরা নেশা করে তাকে ডোবাতে চাইলে সে জেগে থাকে। আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করে যায়। অন্যকে ব্যথা দিয়ে, মেরেধরে বেদনা প্রশমন করতে চাইলেও সে মরে না। আবার কৃতকর্ম হয়ে, সফল হয়ে, তাকে শ্বাসরুদ্ধ করতে চাইলেও সে চলে যায় না। ঘৃণা দিয়ে তার গলা টিপে ধরলেও না। বেদনা ঠিকই জেগে ওঠে, জানান দেয়।

(চলবে…)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: