ব্রেনে ব্রাউন কি প্রাসঙ্গিক? – ১

ব্রেনে ব্রাউন, আনন্দময়ী মজুমদার, পুঞ্জ, বই ব্লগ

নানা জিনিস ঘাঁটতে ঘাঁটতে ব্রেনে ব্রাউনের নাম বারবার চোখে পড়ছিল। তাঁর লেখা পড়ছিলাম। উদ্বুদ্ধ আর বিস্মিত হতে হয়েছে বারবার। তিনি হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সমাজ বিজ্ঞানী ও গবেষক। তাঁর টেড টক আমাদের সমাজের গহীনে এমন ভাবে টর্চ জ্বেলেছে যে তা সম্প্রতিকালে রেকর্ড সৃষ্টি করে। দেখতে দেখতে তাঁর টেড টক শুনেই ফেললাম।

টিভি হোস্ট বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ওপরা উইনফ্রির সাক্ষাৎকারে ব্রেনে ব্রাউনের  সাক্ষাৎকার ও বক্তৃতা দেখেছিলাম তাঁর আগে। জেনেছি বিখ্যাত কবি, লেখক, শিল্পী, এক্টিভিস্ট মায়া এঞ্জেলু অনুপ্রাণিত এই ব্যক্তি মায়া এঞ্জেলুর সাক্ষাতেও এসেছিলেন। এঞ্জেলু তাঁকে তাঁর জরুরি কাজের জন্য অভিবাদন জানিয়েছিলেন। যত শুনেছি, ততই তাঁর কাজকে জানতে আগ্রহী হয়েছি।  আমাদের জানতে ইচ্ছে করছিল, হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝবয়েসী অধ্যাপক ও চেয়ার পারসন ব্রেনে ব্রাউন এমন কী সামাজিক গবেষণা করলেন যে টেড টকের বক্তৃতার মঞ্চে তাঁকে আহ্বান করা হল, আর আজ পর্যন্ত সেই টেড টক শুনতে তেত্রিশ মিলিয়নের বেশি দর্শক ইউটিউবে ভিড় করল? এমন সামাজিক সংযোগ নাকি টেড টকের ইতিহাসে দৃষ্টান্ত। এমন কী বললেন যে দেশবিদেশের টিভি হোস্ট ডাকতে লাগল তাঁকে? এমন কী কাজ তাঁকে করতে হয় লেখালেখি আর গবেষণা ছাড়াও যে তিনি এখন এক সমাজসেবক কম্প্যানির সি.ই.ও.? সরকারী বেসরকারী বিভিন্ন পেশাদারী সংস্থার ব্যবস্থাপনার উন্নতির জন্য, উপদেষ্টা হিসেবে যার ডাক আসে? হাসি হাসি মুখে সহজ ভাষায় কী পরিবেশন করেন এমন? কেন তাঁর বই,‘রাইজিং স্ট্রং’ আর ‘ব্রেইভিং দ্য উইল্ডারনেস’ নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর বেস্ট সেলিং তালিকায় উঠে যায়? কেন তিনি সমাজ, সংসার, ব্যক্তি আর বিশ্বের সীমানায়, রাজনীতি আর পেশাদারী জগতে এক অপরিহার্যতা নিয়ে হাজির হচ্ছেন বারবার? অথচ এই বাংলায় এখনো পর্যন্ত আমরা তাঁর কাজের কথা তেমন শুনতে পাইনি। নিজের মতো পাঠ আর অনুসন্ধানের দিকে এগিয়ে যেতে প্রেরণা পাই।

একটু খোঁজ নিয়ে জানা যায় নাকি এমন এক সমাজ-গবেষক তিনি যিনি ‘শেইম’ (লজ্জা), ‘হেইট’ (ঘৃণা), ‘কারেজ’ (সাহসিকতা), ‘ভালনারেবিলিটি’ (সত্যের স্বচ্ছতায় দাঁড়িয়ে পড়া),‘ডি-হিউম্যানাইজেশন’ (মানুষকে মানবেতর ভাবে তুলে ধরা), ‘এম্প্যাথি’ (সমবেদনা) ইত্যাদি ব্যক্তিগত আর সম্মিলিত মানুষের নানা রকম গহিন জায়গাগুলো নিয়ে বছরের পর বছর অপ্রচলিত ‘অদ্ভুত’ সমস্ত অনুসন্ধানের কাজ করে তা সহজ সাদাসিধে ভাষায় আর অনেক রসবোধের সঙ্গে তুলে ধরেন জনতার সামনে — লেখেনও বটে। বলতে বাধা নেই কথাগুলো প্রথমে শুনেই যে বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে, সে-কথা সত্যি। ব্রেনে এই নিয়ে ঠাট্টা করতে ছাড়েন না। কিন্তু ইউটিউবে তাঁর বিবিধ সাক্ষাৎকার আর টেড টকে তাঁর বক্তব্য শুনে, আর হাসিখুশি অমায়িক লোকটাকে দেখে বুঝতে পারি, তিনি বেজায় ভদ্রলোক হলেও বেজায় ডানপিটে সাহসীও বটে।

ব্রেনেব্রাউন ডট কম বলে একটা ওয়েবসাইট আছে। সেখানে কিছু কথা লেখা। আমি একটু সচেষ্ট ছিলাম সংশয় নিয়ে পড়ার। তবু সংশয় বৃষ্টির জলে ধুয়ে যেতে থাকে একটু যখন পড়ি, “Courage is contagious. Every time we choose courage, we make everyone around us a little better and the world a little braver.” এ কথা গুলি একজন সমাজ বিজ্ঞানীর ব’লেই বিস্মিত হতে হল।

এই লেখার নাতিদীর্ঘ পরিসরে আমি তাঁর ‘ব্রেভিং দ্য উইল্ডারনেস – দ্য কুয়েস্ট ফর ট্রু বিলঙ্গিং এন্ড দ্য কারেজ টু স্ট্যান্ড এলোন’ নামের ২০১৭ সালে প্রকাশিত, বিপুলখ্যাত তাঁর সর্বশেষ বই থেকে বাছাই করা ভাব-নির্যাস তুলে দিচ্ছি।

Brene Brown, Solitude, Anandamoyi Mojumder, Poonjo, Translation in Bangla

নিঃসঙ্গতা

নিঃসঙ্গতা (‘সলিচিউড’ নয়,‘লোনলিনেস’) নিয়ে ব্রেনে ব্রাউনের কিছু পংক্তি আমি দাগ দিয়ে রেখেছি তাঁর ‘ব্রেভিং দ্য উইল্ডারনেস’ বই থেকে। বইটি নিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ায় সাড়া পড়ে গেছে। শুনেছি বইটি নিউ ইয়র্ক টাইমস বেস্ট সেলার। ব্রাউনের লেখার স্বচ্ছতা আর সহজতা আমাদের আকৃষ্ট করে।

বলা বাহুল্য, আমাদের দেশে এমন শারীরিকভাবে বিচ্ছিন্ন বা নিঃসঙ্গ আমরা হয়তো তেমন কেউ নই। জনগণ-পরিবেষ্টিত এলাকায় আমরা বরং হয়তো একটু ফাঁকা নির্জনতাই খুঁজছি। অথচ এও কি সত্য নয়, ঘনবসতির মধ্যে মানুষ আছে, কিন্তু মাঝেমধ্যে মনে হয়,  মানবতা, উষ্ণতার নাগাল কই?

সব মিলিয়ে এই লোনলিনেস নিয়ে কথাগুলো এ দেশের পরিবেশে কেমন খাটবে বলতে পারছি না। তবে আমি দীর্ঘদিন বিদেশে ছিলাম। এখনো ব্যস্ত শহরগুলিতে সময়ের অভাবে মানুষ যে ক্রমশ মানুষ-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে আগের তুলনায় তাও চোখে পড়ে। মানুষ মিশুক জীব – এ কথা বলে আসছে সমাজবিজ্ঞান। কিন্তু সত্যিকারের সংযোগ কীভাবে ঘটতে পারে, এবং নিঃসঙ্গতার ফাঁদ থেকে মুক্তি কীভাবে সম্ভব? ফাঁদ থেকে বের হতে না পারলে তার সামাজিক পরিণতিই বা কী? এসব কথা আমাদের ভাবায়, আমরা যারা এ যুগের দিকে তাকাই, আর আমাদের ঘরে ঘরে তরুণদের মধ্যে, বয়স্কদের মধ্যে ডিপ্রেশনের হার দেখে আঁতকে উঠি, যারা সন্ত্রাসের দুর্ঘটনার মধ্যে এই তিক্ত মানবতা-রহিত  নিঃসঙ্গতার ছায়া দেখতে পাই, এ যুগের শিশুদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার, মানবিক সংযোগের অভাবের অনেক আলামত লক্ষ করি – শিক্ষক, অভিভাবক, মানুষ হিসেবে।

ব্রাউন জানাচ্ছেন, নিঃসঙ্গতা সমাজের একটি ট্যাবু বিষয়। আমরা এই নিয়ে আলচনা করতে ভয় পাই। ব্রাউনের ভাবানুবাদ যা করেছি সেখান থেকে তুলে দিই –

নিঃসঙ্গতাবোধ নিয়ে আমাদের কিন্তু লজ্জা (shame) কাজ করে। যেন নিঃসঙ্গতাবোধ এক ধরনের মনোবিকার। এমনকী এই নিঃসঙ্গতা যখন শোক, মৃত্যু,বিচ্ছেদ বা বুকভাঙা অভিজ্ঞতা থেকে আসে,তখনো। কাচিওপো জানান, নিঃসঙ্গতা নিয়ে আমরা দীর্ঘ দিন যাবৎ যেভাবে কথা বলেছি তার জন্যই এই হাল।

কাচিওপো বলেন, নিঃসঙ্গতা শুধু এক বেদনাদায়ক পরিস্থিতিই নয়, রীতিমত বিপজ্জনক শারীরিক, মানসিক অবস্থা।

আমাদের যখন বিচ্ছিন্ন, একা, নিঃসঙ্গ বোধ হয়,আমাদের মগজ তখন দীর্ঘদিনের বিবর্তনের ফলে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে থাকে। সেই অবস্থায়,আমাদের যদিও সবার আগেই সংযোগ চাই,তবু আমাদের মগজ সংযোগ ছাপিয়ে চেষ্টা করে যায় আত্মরক্ষা করতে, নিজেকে গুটিয়ে রাখতে। তার অর্থ দাঁড়ায়, এই রকম এক সময়ে সমবেদনা (empathy) কমে যায় আমাদের মধ্যে, আত্মরক্ষার বোধ কাজ করে বেশি,এবং আরো নিঃসাড় হয় আমাদের বোধ আর ইন্দ্রিয়গুলি; আরো জেগেও ঘুমিয়ে থাকি আমরা।

তাই নিঃসঙ্গতা দূর করতে হলে আগে তাকে ভালো করে চিনতে হবে। জানতে হবে, নিঃসঙ্গতা মূলত আমাদের শরীরের দেওয়া একটা সতর্কবাণী। এর মর্ম হল আমাদের এখন সংযোগ খুঁজতে হবে। তার মানে এই নয় যে এখুনি আমাদের এক ডজন বন্ধু খুঁজে বের করতে হবে। অনেক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে বন্ধুর সংখ্যায় তেমন কিছু এসে যায় না,এসে যায় বন্ধুত্বের উৎকর্ষ (কোয়ালিটি) কেমন, তার ওপর।

বিশ্বব্যাপী গবেষণা নিয়ে কাজ করতে করতে গবেষক জুলিয়ান হল্ট-লানস্ট্যাড,টিমোথি বি স্মিথ এবং জে ব্র্যাডলি লেয়টন আবিষ্কার করলেন এই অদ্ভুত তথ্যটি – বায়ু দূষণ নিয়ে বেঁচে থাকলে মৃত্যুর ঝুঁকি (odds) বেড়ে যায় শতকরা ৫ ভাগ। শারীরিক মেদবাহুল্য থাকলে সেই  ঝুঁকি দাঁড়ায় শতকরা ২০। অতিরিক্ত অ্যালকোহল খেলে ঝুঁকি বাড়ে ৩০%। আর নিঃসঙ্গতা নিয়ে বেঁচে থাকলে? সেক্ষেত্রে আমাদের ঝুঁকি বাড়ে ৪৫%।

(চলবে…)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: