কবি শামসেত তাবরেজীর অথরশিপের অন্যরূপ

আলমগীর হক স্বপন,

কবি শামসেত তাবরেজীর চৈতন্যের আলোকে, আবর্তনে বৈচিত্র্য থাকলেও কিন্তু আছে একটা অথরশিপ ! এই অথরশিপ কিংবা রচয়িতার তাঁর মনন ব্যাখ্যা তাড়িত হয় সভ্যতার সংকটে ! সে সংকট মূল্যায়নে আন্তর্জাতিকতার চেয়ে যেন স্বদেশ সংকট পর্যবেক্ষণই আরাধ্য বিষয়, তাতে আছে সকল পাংশুর অভিব্যক্তি ! যেন কোন ছাই পাঁশ কিছুই ছাই চাপা দেয়া যায় না!

এই সকল স্বাদেশিকতার সংকট যেন আমাদের রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ভূমিকে গ্রাস করছে কবি তাঁর নিজস্ব ভাষায় অর্থাৎ পূর্ব বাংলার ভাষিক টানে কাব্য শিল্প প্রস্তর তৈরি করেন তার অন্তরে থাকে শ্লেষ, ভ্রুকুটি, রম্য রসবোধ এই সকল অভিব্যক্তি সম্প্রসারিত হয় মিথ্যের মুখোশ খুলে দেয়ার নিমিত্তে অর্থাৎ কিনা কবির ভূমিকা হল উন্মোচক হিসেবে! এখানে আজ কবির কাব্য রচনা সম্পর্কে কিছু বলতে আসিনি! আজকের বিষয় শিল্পীর অন্যরূপ, শিল্পসৌকর্য্যের নূতন যাত্রা অর্থাৎ তাঁর চিত্রশিল্পের অথরশিপ !

কবি ইদানীং কালে ফেইসবুক থেকে একেবারে বিদায় না নিলেও, ফেইসবুকের তাঁর সুপ্ত পদচারণয় আমরা তাঁর ভেতরের রেখাচিত্রের প্রতি ঝোঁক লক্ষ্য করি। চারুশিল্পের দিকে তাঁর অসীম শক্তি ও তাঁর প্রকাশ কৃতি আমরা পর্যবেক্ষণ করি! শিল্পী যেন আমাদের কতিপয় বন্ধুদের সামনে ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে চলেছেন ডিজিটাল আর্টফর্মে ! আমরা দেখেছি কম্পিউটারে বসে হাতে খড়ি সে সকল ডিজিটাল গঠন শৈলী, বস্তুত তা আকর্ষণীয়, তদুপরি ক্ষেত্র বিশেষে প্রথম পর্যায়ে মনে হতো, সে কি ! কেবলই সখ, খেলাচ্ছলে নাকি কি গভীর অভিনিবেশ ! কিন্তু কালক্রমে সে শিল্প চক্ষুর পরিচয় পাই তাঁর লুকিয়ে থাকা নান্দনিক সৌকর্যের অভিপ্রায়। শিল্পীর রচিত রচনায়, কি বর্ণ, কি রেখন, কি তাঁর গঠন প্রক্রিয়া অসাধারণ কাজ আমাকে সবিশেষ মুগ্ধ করেছে।

ডিজিটাল কাজগুলোর পরে আরও আশ্চর্য হওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে, অনেক রেখাচিত্রের সুনিপুণ প্রকাশ কৃতি শুরু হয় একের পর এক ! তাঁর কাজ কালো চারকোলের কাজ মনে হবে লিথোপ্রিন্টের মতন, কিছু কাজে আছে স্রেফ রেখাচিত্র যা অবিরাম চলিষ্ণু ! কাব্য সাহিত্যের মতনই কবি শামসেত তাবরেজীে এখানেও, একই বিষয়ী অথরশীপের কথা বলেন অসীম সূক্ষ্মতায় সামাজিক রাজনৈতিক প্রপঞ্চে !

তাঁর, শিল্পী শামসেত তাবরেজীর জীবাশ্ম আকৃতির অবয়বের অন্তরে ও বাইরে কি সুনিপুণ রেখা’খচিত অঙ্কনরীতি তা বিস্ময়কর। আমার মনে হয় শিল্পী তাবরেজী আমাদের নিয়ে যান ভারতবর্ষের মধ্যপ্রদেশের আদি বাসিন্দাদের মুখচ্ছবির মধ্যে আর তাঁর তৈরি সে প্রস্তর যুগের প্রস্তর শিল্পের আঁকার দিয়েছেন, দিয়েছেন আদি মানুষের আধুনিক মাত্রা তাঁরা এখন নাগরিক নারী পুরুষের আদল পেয়েছে !

আমি শিল্পীর এই ছবির নামকরণ করলাম ‘শক্তি ও বানরের আখ্যান’ সুসান সন্টাগের বাঁধা অতিক্রম করে! সুসান চিত্রের শিরোনাম দেয়ার বিষয়ে বলেন তা দর্শকের ব্যাখ্যা করার ব্যাপ্তিকে ব্যাপ্ত করে না বরং তা সীমারেখায় আবদ্ধ করে! এখানে শিল্পী কবি শামসেত তাবব্রেজী ইমেজের বিভ্রম তৈরি করেন তাঁর আরাধ্য অতিবাস্তবের কল্যাণে নানা অনুষঙ্গ সংস্থাপনায় ।

এই ক্ষেত্রে আনেন পেশী বহুল কাঁধ আর বাহু, তাঁর নিচে একটি মুখাবয়ব , মুখের নিচে অবস্থান নিয়েছে মুখের ঠোঁট ও দাড়ি কিন্তু বিভ্রম তৈরি হয় যখন মনে হবে না শুধু মুখের দাড়ি, ওটা ঘটি ! ইমেজের বিভ্রম তৈরি করেন! তাঁর গঠন প্রণালী উল্লম্ব বিভাজনের বাঁ দিকে আছে শুয়োরের আদলে মুখ খানা, মুখের পাশে চোখের মতন করে উল্লম্ব ভাবে চোখের পুনরাবৃত্তি, অবস্থানে মনে হবে কোটের বোতাম, তাঁর নিচে আছে অসহায় বানরের গেঁথে থাকা চোখ বিস্ফারিত ! এই ডি-টেইলস গুলো উল্লেখ করার মধ্যে আমি এই গ্রোটেক্সের আজব জগত তৈরিতে শিল্পী যে কত সিদ্ধহস্ত তাই দেখাতে চেয়েছি, সেই শিল্পবোধ সাক্ষ্য দেয় ।

শামসেত তাবরেজীর আরও একটি কাজ প্রস্তর যুগের উদাহরণ । এতে শায়িত ফিগারের অন্তরে আছে দেহের নানা অনুষঙ্গ, কখনো চক্ষুদ্বয় তীব্র দৃষ্টি হানে, কখনো স্তণভার, পাখী, মাছ, হাতের আলুলায়িত ভঙ্গী ! চিত্রের অগ্রভাগে মাছের পাশে সন্নিবেশিত হয় চক্ষু নাসিকা, ভয়াল দন্ত, সব কিছু অতি বাস্তবের কথা বলে, বলে ভয়ের কথা, জীবনটাই যেন সংকটাপন্ন জীবাশ্ম । এই জীবাশ্ম প্রতিম কাজগুলো প্রত্যক্ষ করলে আমরা আধুনিক শিল্প প্রকরণে খুঁজে পাই একটি ভয়াল কিংবা শকিং এর অনুষঙ্গ তা হলও গ্রোটেক্স/ grotesque! একটি আধুনিক প্রতিবাদী শিল্প প্রকরণ !

এই ভীতিপ্রদ চিত্রপটের অভিব্যক্তির চিত্রকলা আমরা শিল্পকলার ইতিহাসে মধ্যযুগের ইউরোপের শিল্পী হিরোনিমাস ব্যস চিত্রকর্মে দেখতে পাই, আধুনিক যুগের দালির ‘সেলফ ক্যানিবালিজম ক্রিয়েচার’, ফ্রান্সিস বেদনের ‘ ট্রেজিক এনাটমিস’, পিকাসোর ‘বুলফাইটার’, হান্স বিলামারের ‘মিউটিলেটেড ডলস’ ! এই সকল চিত্রকর্ম স্ব স্ব দেশের প্রত্যক্ষ চেতনা বাহী রাজনৈতিক কিংবা সাংস্কৃতিক , এমন কি ধর্মীয় সমালোচনা থেকে উত্থিত, যা আমরা শিল্পী কবি তাবরেজীর চিত্রকর্মে পাই, তাঁর মনোভূমি ঘটমান সামাজিক বিগ্রহকে তুলে ধরে! এই সকল চিত্রের অভিঘাত প্রতিবাদী শিল্পকলার নামান্তর !

চিত্রগুলোর ব্যাখ্যায় আমরা পাই অত্যন্ত কষ্টকর যাপিত জীবনের প্রকাশ কৃতি যা ভয়ে কাতর স্পন্দনহীন পাথর! শিল্পীর প্রায় সকল সাদা কালোর গ্রাফিক্সের অংকন রীতির ছবি রূপান্তরিত হয় জীবাশ্মে ! তাঁর অঙ্কনরীতির রেখা বা লাইনের মুখ্য ভূমিকা তাঁর হাতের বলিষ্ঠ আচরণ একজন আদর্শ শিল্পীর যেন প্রতিচ্ছবি, যেন সামাজিক অঙ্গীকারের, দায়িত্ব বোধের শিল্পী! তাঁর পরিশ্রমী স্কেচি/ রেখা’খচিত লাইন ওয়ার্ক তাঁর কৃত অবয়বের শরীরের অভ্যন্তরীণ ডিটেলস একজন গ্রাফিক্স এবং এচিং শিল্পীর সাথে পরিচয় ঘটিয়ে দেয় আমাদের। আজকে আমাদের শিল্প অঙ্গনে তাঁর নাম খচিত হোক তাঁর শিল্প ভাষার পরম রেখাচিত্রের টেক্সচারের সে নান্দনিকতায় ! আজ হোক তাঁর শিল্পাকাশের অভিষেক !

One thought on “কবি শামসেত তাবরেজীর অথরশিপের অন্যরূপ

  1. চমৎকার বিশ্লেষণ।
    ছবি বুঝি না। তারপরও এ আলোচনায় জানতে আঁকিয়ে তাবরেজি ভাইয়ের গুণপনা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: