নিধুবাবুর গান – বাঙলা গানের এক বিস্মৃতপ্রায় বিপ্লব

যে সময়ের কথা বলছি, তখনো কলিকাতা শহরের শৈশব কাটে নি। সেই সময়কার কথা। নিধুবাবু ওরফে রামনিধি গুপ্তের জন্ম ১৭৪১ সালে। ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে হারানোর পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলিকাতায় তার হুকুমত ঠিকমত প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পায়। তখনকার বাঙলা গানের নানা ধারা ছিল। মানুষের মুখে মুখে ফেরা বাহিরানার গান তো ছিলই, তাছাড়া ছিল শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অপভ্রংশ নানা ধরণের গান। ছিল বৈঠকী গান, আখড়াই গান।

সেই সময়ে গান মানেই হলো রাধাকৃষ্ণের বা দেবদেবীদের প্রেমের গান। রক্তমাংসের মানুষের প্রেম নিয়ে গান মানে রীতিমত অশ্লীলতা! বাঙলা গানের রোমান্টিসিজমের ধারণায় জোরেশোরে ধাক্কা দিয়ে বসলেন নিধুবাবু। এ প্রসঙ্গে বলা দরকার, নিধুবাবু বাঙলা টপ্পার জনক। টপ্পা একধরণের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আঙ্গিকে গাওয়া লিরিকধর্মী গান। বিশেষ এক ধরণের সুরে গাওয়া হয়। সেকালের লক্ষ্ণৌর নামজাদা ওস্তাদ শোরি মিঞা ছিলেন টপ্পা গানের বিরাট কলাকার। তাঁর গুণেই টপ্পা গান জনপ্রিয় হয়েছিল। নিধুবাবু তখন কালেক্টরি আপিসে চাকরি নিয়ে বিহারের ছাপরা জেলায়। সেখানে এক ওস্তাদের কাছে কিছুদিন মার্গসঙ্গীতের তালিম নেন। পরে ছাপরার রতনপুর গ্রামের ভিখন রামস্বামীর মন্ত্রশিষ্য হন। গান শেখেন নানাজনের কাছে। নানারকমের গান। উত্তরভারতের গানের সাথে তাঁর নিবিড় পরিচয় ঘটে। সেই সময়ই শোরি মিঞার টপ্পার সাথে তার যোগাযোগ। লিখলেন বাঙলা টপ্পা। ওস্তাদরা নাক কুঁচকালো, “বাঙলায় আবার টপ্পা!” একটা জনপ্রিয় গানের বাণী এরকম-

“অনুগত জনে কেন করো এত প্রবঞ্চনা।
তুমি মারিলে মারিতে পারো, রাখিতে কে করে মানা।।
যদি করে থাকি অপরাধ।
প্রেম ডুরি দিয়ে বাঁধ।।
এ যে বিনা অপরাধে বঁধু
এ কী রে তোর বিবেচনা।।”

পণ্ডিতেরা হাঁ হাঁ করে উঠলো। এ যে চূড়ান্ত অশ্লীল। রাধাকৃষ্ণ, দেবদেবী না, মানুষের পিরিতি নিয়ে গান!  মানুষ কিন্তু ঠিকই গ্রহণ করলো নিধুবাবুর গান। এ যে আনকোরা নতুন স্বাদ, নতুন বিষয়! সেই সময়ের বাঙলা গানের রোমান্টিসিজমের তুলনায় তাঁর গানের রোমান্টিসিজম অনেক গভীর ও পরিণত। যেমন, একটা গানে নিধুবাবু বলছেন-

“ভালবাসিবে বলে ভালবাসিনি
আমার স্বভাব এই
আমি তোমা বই আর জানি নে…”

মানুষের প্রতি মানুষের এই সরল প্রেম নিবেদন তখনকার গানে ছিল না সরাসরি। ছিল দেবদেবীদের মুখোশের আড়ালে, ছিল রাধাকৃষ্ণের জবানিতে। তখনকার প্রেমের গানের আরেকটা সীমাবদ্ধতা ছিল রূপনির্ভরতা। রোমান্টিকতা জিনিসটাই ছিল রূপনির্ভর। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বা বৈষ্ণব পদাবলী খুললেই দেখতে পাবেন দৈহিক বিভঙ্গের রগরগে কামুক বর্ণনা। নিধুবাবুর গান সেই তুলনায় একেবারেই অন্য জাতের। তাঁর গানে রূপের চেয়ে নরনারীর সম্পর্কের গভীর ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়াই প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। রূপের কথা নেই তা নয়, আছে তো বটেই। কিন্তু সেটা মূখ্য না। রোমান্সের মনস্তাত্ত্বিক সূত্র যেন অনুসন্ধান করেছেন নিধুবাবু তাঁর গানে। উপরের গানটাই দুটোই এর ভাল উদাহরণ।

নিধুবাবু চাকরি ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন ১৭৯৪ সালে। শোভাবাজারে একটা আটচালা ঘরে আসর বসান তাঁর গানেন। ঘরটা ছিল একজন আমেরিকান, ক্যাপ্টেন মুচ্ছুদ্দির। এই আসরে গান হতো রাতে। এইখানে আরেকটা মজার ব্যাপার আছে। সেকালের গাইয়েরা ছিল মূলত ধনী লোকদের অনুগ্রহে পালিত। কিন্তু, নিধুবাবু কারো বাড়ি গাইতে যেতেন না। তাঁর গান শুনতে হলে তার আখড়ায়ই আসতে হতো। আখড়া ছিল সকলের জন্য উন্মুক্ত। ইতর-বিশেষের ভেদাভেদ সেখানে ছিল না। আখড়ার কথা উঠলো যখন বলি, আখড়াই গান আগেই ছিল। কিন্তু, সেই আখড়াই গান কালে কালে অশ্রাব্য ঝগড়াঝাঁটির আসরে পরিণত হয়েছিল। নিধুবাবু আখড়াই গানের পুনর্জন্ম দেন। নিধুবাবুর এই নবতর আখড়াই কলকাতায় বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। নিধুবাবুর মৃত্যুর পর অবশ্য আখড়াই আবার তার গৌরব হারায়।

কালের বিচারে সবকিছু চিরকাল টেকে না। নিধুবাবুরও সব গান টেকে নি। তাঁর টপ্পা গানগুলোই মূলত তাঁকে অমর করে রেখেছে। প্রজন্মান্তরে সেই টপ্পা গান আমরা লিখতে দেখি রবীন্দ্রনাথকেও। বাঙলা গানে টপ্পা একটা স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। তার জন্য প্রথম প্রণতি অতি অবশ্য নিধুবাবুরই প্রাপ্য। আমরা তাঁর গান মূলত শুনি রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের গলায়। একবার শুনলে দীর্ঘ অনুরণনের মত মাথার ভিতরে বেজে চলে-

“তবু কেন যে ভালবাসি,
তাহা নিজেই জানি নে।
আমার স্বভাব এই,
তোমা বই আর জানিনে। “

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: