রেডিও

১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১। সকাল :৩০ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কোয়ার্টারে নিজের বাসায় এক কাপ চা নিয়ে বসে আছেন পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোর্শেদ আহমেদ। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে তার পছন্দের আরভিন রেডিওর নব ঘুরিয়ে স্টেশন ধরার চেষ্টা করছেন। গত নয় মাসে একদিনও পার করেননি তিনি এই রেডিও ছাড়া। শুধু নয় মাস কেন? গত বছর ধরেই এই রেডিও তার সঙ্গী।

১৯৬৭ তে ইংল্যান্ডে পিএইচডি করার সময়ে তিনি রেডিওটি কিনেছিলেন, ১৯৬৮ তে দেশে ফেরার সময়ে রেডিওটি সাথে নিয়ে এসেছিলেন। এরপর তো দেশে ফেরার তিন বছর পেরিয়ে গেলো। কত ঘটনা, কত অস্থিরতার মধ্য দিয়ে দেশ গেলো, সব খবরই মোর্শেদ সাহেব পেতেন এই রেডিও থেকেই। ১৯৭১ এর ২৫ মার্চের সেই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক, ছাত্র নিহত হলেও ভাগ্যক্রমে তিনি তার পরিবার বেঁচে যান। মার্চের উত্তাল দিনের শুরুতেই স্ত্রী একমাত্র মেয়েকে নিয়ে জয়পুরহাট গিয়েছিলেন তার শশুরবাড়িতে। মার্চের ২৬ তারিখে ফিরবেন চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু অন্তত ২৫ মার্চ পর্যন্ত এমনই পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু কেন যেন তার মন একদমই টানছিলোনা। মনে হচ্ছিলো কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। ঘটেছিলোও তাই। ২৫ মার্চ অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিলেন তিনি। ঘুম আসছিলোনা। পরেরদিন ২৬ মার্চ সকালে তিনি তার সেই প্রিয় আরভিন রেডিও তে কলকাতার আকাশবানী ধরার চেষ্টা করেন। আর তখনই শুনতে পানপূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে 

যুদ্ধ লেগেই গেলো তাহলে। কি হবে এখন?” – পাশে বসে জিজ্ঞেস করলেন তার স্ত্রী শরীফা। তার চেহারায় ভয়ার্ত অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে। খুব ঘামছে সে। এমনিতেই প্রচন্ড ভয় পায় সে আর গৃহযুদ্ধের খবর পেয়ে তার ভয় যেন আরও বেশি বেড়ে গিয়েছে। 

এপ্রিলের এক তারিখ শশুরবাড়ির অনুরোধ উপেক্ষা করে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন। প্রথম কয়েকদিন নিজেকে সামলাতে পারেননি যখন ২৫ মার্চ রাতে বেঁচে যাওয়া মানুষেরা তার কাছে এসে বলেছিলো সেই রাতের কাহিনী। এমনকি তার পাশের ফ্ল্যাটে থাকা তার সহকর্মীকেও মেরে ফেলেছে সেই রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এত মৃত্যুর ভিড়ে সেদিন নিজে বেঁচে যাওয়ার ফলে নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে করেছিলেন মোর্শেদ সাহেব। এপ্রিলের পর থেকে ঢাকাতেই ছিলেন তিনি তার পরিবার। একেকটা দিন যেন একেকটা যুগের মত দীর্ঘ মনে হয়েছে এই দিনগুলো। মনে হতো এই বোধহয় এসে ধরে নিয়ে যাবে তাকে। আরভিন ব্র্যান্ডের এই রেডিও প্রতিদিনই শুনতেন তিনি তার স্ত্রী। বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, আকাশবানী ধরার চেষ্টা করতেন তিনি তার রেডিওতে, শুনতে চাইতেন আশার কথা। 

গতকাল ১৪ ডিসেম্বর অনেক শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিকদের ধরে নিয়ে গিয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের দোসররা। মিত্র বাহিনীর লড়াইয়ে পাকিস্তানি বাহিনী অনেকটাই কোনঠাসা হয়ে পড়েছে। যেকোনো মুহুর্তে তাদের পরাজয় ঘনিয়ে আসবে। এমন অবস্থাতে তাদের ধরে নিয়ে গেলো। বিজয় নিশ্চিত জেনেও তারা দেখে যেতে পারলোনা সেই বিজয়। মনের অজান্তেই এসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন মোর্শেদ সাহেব। রেডিওতে কলকাতা স্টেশন ধরার চেষ্টা করলেন, জানতে পারলেন আজ বিকাল থেকে আগামীকাল পর্যন্ত আকাশযুদ্ধ বন্ধ থাকবে আর পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাক, শীঘ্রই স্বাধীন হয়ে যাবে দেশ। ঘড়ি দেখলেন মোর্শেদ সাহেব। সকাল ৮ঃ১৫ মিনিট। টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত কারফিউ শিথিল করা হয়েছে। ঘরে তেমন কিছু নেই। আজ বের হবেন বাজার করতে। স্ত্রী এর মধ্যেই বাজারের ফর্দ হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন। আজ ফর্দে যা লেখা আছে, সবগুলোই বেশি পরিমানে নিয়ে আসবেন মজুদ করে রাখার জন্য। নিউ মার্কেট কাচাবাজার থেকে বাজার সদাই করে গাড়িতে তেল ভড়িয়ে ১২ টার আগেই ফিরে এলেন কোয়ার্টারে। 

দুপুরের পর থেকেই মোর্শেদ সাহেবের মনটা খুব বিষন্ন হয়ে আছে। দুশ্চিন্তাও হচ্ছে। বিজয় প্রায় নিশ্চিত জেনেও আনন্দিত হতে পারছেননা একদমই। মনে হচ্ছে গতকাল যেসকল মানুষকে ধরে নিয়ে গিয়েছে তাদের কথা। মনকে ভালো রাখার চেষ্টা করলেন মোর্শেদ সাহেব। বিকেলের দিকে বারান্দায় রেডিও নিয়ে বসেছিলেন আবার, যুদ্ধের খবর যদি জানা যায়। এমন সময়ে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পেলেন তিনি। শব্দটা তীব্র। পাশের ঘর থেকে দৌড়ে এলেন তার স্ত্রী। তিনি কিছুতেই খুলতে দিবেননা দরজা। কিন্তু না খুলেও কোনো উপায় নেই। ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। মোর্শেদ সাহেব এগিয়ে গেলেন দরজা খুলতে। পেছন পেছন স্ত্রী। দরজা খুলতেই মোর্শেদ সাহেব দেখতে পেলেন তারই দুজন ছাত্রকে। গত বছর অনার্স শেষ করেছে এরা। 

স্যার, একটু যেতে হবে আমাদের সাথে। চিন্তা করবেননা কাজ শেষ হলেই আমরা আপনাকে বাড়ি পৌছে দেবো

তুমি একা যেওনা, আমাকেও সাথে নিয়ে যাও” – মোর্শেদ সাহেবকে অনুরোধ করলেন তার স্ত্রী। 

তুমি বাড়িতে থাকো, মেয়ে একা আছে। আমি চলে আসবো চিন্তা করোনা” – মোর্শেদ সাহেব একটা মলীন হাসি দিয়ে বললেন। তিনি বুঝেই ফেলেছেন কি ঘটতে যাচ্ছে। 

মোর্শেদ সাহেব কে নিয়ে গেলো তার দুই ছাত্র বারান্দা দিয়ে স্ত্রী সেই দৃশ্য দেখছিলেন। ভীতসন্তস্ত্র হয়ে ঘরে প্রবেশের আগে দেখতে পেলেন মোর্শেদের রেডিওটি ঝিরঝির শব্দ করছে। কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই তার। কি হবে এখন? কি করবেন তিনি? এগুলো ভাবতে ভাবতে দৌড়ে গিয়ে তিনি তার মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন

১৬ ডিসেম্বর। ২১ ঘন্টা হয়ে গেলো কিন্তু মোর্শেদ সাহেব ফিরলেননা। কেউ কোনো খোজও দিতে পারেননি তার। বিকেলে মোর্শেদ সাহেবের স্ত্রী খবর পেলেন পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পন করেছে। তিনি নিজেও বুঝতে পারলেন তা, রাস্তায় অনেকে আনন্দ করছে বিজয়ের। সবার মনেই আনন্দ, কিন্তু তার মনে আনন্দ নেই। মোর্শেদ কি বেঁচে আছে? আদৌ কি ফিরবে? প্রচন্ড ভেঙ্গে পড়ে কাঁদতে লাগলেন তিনি। রাত ১০টায় খানিকটা সামলে নিলেন নিজেকে। দৌড়ে গিয়ে বারান্দা থেকে মোর্শেদের প্রিয় রেডিওটি এনে নব ঘুরাতে লাগলেন। ঘুরাতে ঘুরাতে বিবিসি ধরলেন আর ১০ঃ১৫ মিনিটে বিবিসির বিশেষ বাংলা প্রতিবেদনে শুনতে পেলেন পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পনের কথা  

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ অনুসরণ

Get the latest posts delivered to your mailbox: